অনলাইনে আয়

ইন্টারনেটের ইতিহাস ও বাংলাদেশে ৫জি বিপ্লব: আর্পানেট থেকে আধুনিক সাবমেরিন ক্যাবল
৫জি প্রযুক্তি

নিউজ ডেস্ক

August 9, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বিশেষ প্রতিবেদন — আধুনিক সভ্যতার চালিকাশক্তি হলো ইন্টারনেট। ১৯৬০-এর দশকে স্নায়ুযুদ্ধের আবহে শুরু হওয়া একটি সামরিক গবেষণা প্রকল্প থেকে আজকের বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হাই-স্পিড ৫জি নেটওয়ার্ক—ইন্টারনেটের এই রূপান্তর মানব ইতিহাসের অন্যতম যুগান্তকারী ঘটনা। বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেটের উৎপত্তি, বিকাশের ইতিহাস এবং বাংলাদেশে ইন্টারনেটের আগমন থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের নতুন সাবমেরিন ক্যাবল ও ৫জি প্রযুক্তির বর্তমান চিত্র এই প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

১. বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট আবিষ্কারের ইতিহাস

ইন্টারনেটের উদ্ভব কোনো একক বিজ্ঞানীর হাত ধরে হয়নি; বরং এটি বহু দশক ধরে বিজ্ঞানের ধারাবাহিক গবেষণার ফল।

[ কোল্ড ওয়ার / ARPANET (১৯৬৯) ] ──► [ TCP/IP প্রোটোকল (১৯৭৪) ] ──► [ WWW ও পাবলিক ইন্টারনেট (১৯৯১) ]

ক. আর্পানেট (ARPANET): বিশ্বের প্রথম ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক

  • উৎপত্তি: ১৯৬৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের অধীনস্থ ‘Advanced Research Projects Agency’ (ARPA) স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন পারমাণবিক হামলায় অক্ষত থাকতে পারে এমন যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে ARPANET তৈরি করে।
  • প্রথম বার্তা (২৯ অক্টোবর, ১৯৬৯): আর্পানেটের মাধ্যমে প্রথম বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। বার্তাটি ছিল “LOGIN”, তবে “LO” লেখার পরই সিস্টেম ক্র্যাশ করে। এটিই ছিল ইতিহাসের প্রথম ডিস্ট্রিবিউটেড নেটওয়ার্ক বার্তা।
  • প্যাকেট সুইচিং (Packet Switching): পল বারান ও লিওনার্ড ক্লেইনরক উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বড় ডেটাকে ছোট ছোট প্যাকেটে ভাগ করে ভিন্ন ভিন্ন রুটে গন্তব্যে পাঠানো শুরু হয়।

খ. ইন্টারনেটের জনক ও WWW-এর উন্মোচন

  • TCP/IP প্রোটোকল (১৯৭৪): ভিন্টন সার্ফ (Vint Cerf) ও বব কান (Bob Kahn) আবিষ্কার করেন TCP/IP প্রোটোকল, যা বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন নেটওয়ার্ককে একত্রিত করার ভাষা জোগায়। তাদের ‘ইন্টারনেটের জনক’ বলা হয়।
  • ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (১৯৮৯-১৯৯১): স্যার টিম বার্নার্স-লি (Tim Berners-Lee) উদ্ভাবন করেন WWW (World Wide Web) এবং HTML ল্যাঙ্গুয়েজ। ১৯৯১ সালে ইন্টারনেট সর্বসাধারণের জন্য উম্মুক্ত করা হয়।

২. বাংলাদেশে ইন্টারনেটের আগমন ও বিবর্তন

বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তিতে রূপান্তর শুরু হয় ধাপে ধাপে:

সময়কালপ্রযুক্তির ধরনবিবরণ ও মাইলফলক
১৯৯২ – ১৯৯৪অফলাইন ইমেইল (UUCP)‘ড্রিক আইসিটি’ প্রথম অফলাইন ইমেইল চালু করে। মেসেজ জমা রেখে দিনে কয়েকবার বিদেশের সার্ভারে ডায়াল-আপ করা হতো।
৬ জুন, ১৯৯৬অনলাইন ইন্টারনেটISN (Information Services Network)-এর মাধ্যমে দেশে প্রথম অনলাইন ইন্টারনেট চালু হয় (bangla.net)। ভি-স্যাটভিত্তিক ৬ কেবিপিএস গতির ডায়াল-আপ কানেকশনে মিনিটে খরচ হতো ৩ টাকা।
২০০৬ (মে)সাবমেরিন ক্যাবল (SEA-ME-WE 4)বাংলাদেশ প্রথম আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবল কনসোর্টিয়ামে যুক্ত হয়ে কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশনের মাধ্যমে উচ্চগতির অপটিক্যাল ফাইবার যুগে প্রবেশ করে।

৩. বাংলাদেশে সাবমেরিন ক্যাবল ও ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা (২০২৬ হালনাগাদ)

বর্তমানে দেশের ক্রমবর্ধমান ডেটা চাহিদা মেটাতে এবং একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমাতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্প যুক্ত হচ্ছে:

                          [ বাংলাদেশের মোট ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা ]
                                            │
      ┌─────────────────────────────────────┼─────────────────────────────────────┐
      ▼                                     ▼                                     ▼
[ SEA-ME-WE 6 (সরকারি) ]            [ BPCS Consortium (বেসরকারি) ]               [ বাঘা-১ (Bagha-1) ]
(অতিরিক্ত ১৩.২ Tbps যুক্ত)           (কক্সবাজার-সিঙ্গাপুর রুটে ৫১ Tbps)             (ব্যাকআপ ও সাইবার নিরাপত্তা)
  1. তৃতীয় সরকারি সাবমেরিন ক্যাবল (SEA-ME-WE 6): সরকারি প্রতিষ্ঠান BSCCL-এর অধীনে সিঙ্গাপুর থেকে ফ্রান্স পর্যন্ত বিস্তৃত এই ক্যাবলটি কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশনের সাথে যুক্ত হচ্ছে, যা দেশে ১৩.২ টিবিপিএস (Tbps) নতুন ব্যান্ডউইথ যুক্ত করবে।
  2. প্রথম বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল (BPCS Consortium): নোኪያ (Nokia)-র ইকুইপমেন্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে বেসরকারি কনসোর্টিয়াম সিঙ্গাপুরের সাথে সরাসরি নিজস্ব ক্যাবল বসাচ্ছে। এর ফলে দেশে ৫১ টিবিপিএস (Tbps) সক্ষমতা বাড়বে এবং লেটেন্সি কমে মাত্র ৩৩ মিলি-সেকেন্ডে নামবে।
  3. বাঘা-১ (Bagha-1): সিডিনেট (CdNet) ও মার্কিন USTDA-এর অর্থায়নে অতিরিক্ত সাবমেরিন ক্যাবলের কাজ চলছে, যা দেশের সাইবার সিকিউরিটি ও ব্যাকআপ নিশ্চিত করবে।

৪. বাংলাদেশে ৫জি (5G) প্রযুক্তির বর্তমান অবস্থা ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে শহর ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে ৫জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কাজ এগিয়ে চলেছে:

  • বাণিজ্যিক কভারেজ: গ্রামীণফোন ও রবি বিভাগীয় শহরসহ দেশের ৪৪০টিরও বেশি নির্দিষ্ট লোকেশনে (বিমানবন্দর, বিশ্ববিদ্যালয় ও বাণিজ্যিক এলাকা) ৫জি সেবা সচল করেছে। টেলিটকও তাদের অবকাঠামো প্রস্তুত করছে।
  • নতুন স্পেকট্রাম পরিকল্পনা: বিটিআরসি (BTRC) ৫জি-র পূর্ণাঙ্গ কভারেজের জন্য ৩.৫ গিগাহার্টজ (GHz) ব্যান্ডের নতুন তরঙ্গ বরাদ্দের রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করছে।

৫জি বিস্তারের প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ

চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রবর্তমান চিত্র ও বাধা
৫জি হ্যান্ডসেটের অভাবস্থানীয় বাজারে উৎপাদিত ফোনের মাত্র ৪.৭৪% ৫জি সমর্থিত। এখনও ৬১% ফিচার ফোন এবং ৩৪% ৪জি হ্যান্ডসেট ব্যবহার হচ্ছে।
শিল্প খাতের ইকোসিস্টেমস্মার্ট পোর্ট, কৃষি ও অটোমেটেড ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে ৫জি-র পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার গড়ে উঠতে আরও সময়ের প্রয়োজন।

ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি

নতুন সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্পগুলো সম্পূর্ণ সচল হলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা ৫০,০০০ জিবিপিএস (Gbps) ছাড়িয়ে যাবে। এর ফলে একদিকে যেমন গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের খরচ হ্রাস পাবে, অন্যদিকে ৫জি প্রযুক্তির পূর্ণ সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়ে ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত শক্ত হবে।

১. আন্তর্জাতিক ইন্টারনেটের ইতিহাস ও আর্পানেট (ARPANET)

  • আর্পানেট ও প্রথম বার্তার ইতিহাস:
    • উৎস: US Defense Advanced Research Projects Agency (DARPA) ও UCLA Computer Science Department Archive।
    • তথ্য: ১৯৬৯ সালের ২৯ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (UCLA)-র অধ্যাপক লিওনার্ড ক্লেইনরক (Leonard Kleinrock) ও তার দল প্রথম “LOGIN” বার্তাটি পাঠাতে গিয়ে “LO” লেখার পর সিস্টেম ক্র্যাশ করে।
  • TCP/IP ও ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (WWW):
    • উৎস: Internet Hall of Fame এবং CERN (European Organization for Nuclear Research)।
    • তথ্য: ১৯৭৪ সালে ভিন্টন সার্ফ ও বব কান কর্তৃক TCP/IP প্রোটোকল আবিষ্কার এবং ১৯৮৯-১৯৯১ সালে স্যার টিম বার্নার্স-লি কর্তৃক WWW আবিষ্কারের মাধ্যমে পাবলিক ইন্টারনেট উন্মুক্ত হয়।

🇧🇩 ২. বাংলাদেশে ইন্টারনেটের আগমন ও বিবর্তন

  • প্রথম অনলাইন ইন্টারনেট ও ISN (১৯৯৬):
    • উৎস: বাংলাদেশ টেলিকম বা রেজিস্টার্ড আইএসপি আর্কাইভ এবং তৎকালীন সংবাদপত্র ও জাতীয় প্রযুক্তি আর্কাইভ।
    • তথ্য: ১৯৯৬ সালের ৬ জুন ‘ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্ক’ (ISN)-এর মাধ্যমে bangla.net ডোমেইনে ভি-স্যাট (VSAT) প্রযুক্তিতে ডায়াল-আপ ৬ কেবিপিএস ইন্টারনেটের প্রথম বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয়।
  • প্রথম সাবমেরিন ক্যাবল SEA-ME-WE 4 (২০০৬):
    • উৎস: বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেড (BSCCL) প্রেস রিলিজ।
    • তথ্য: ২০০৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক ফাইবার অপটিক ক্যাবল কনসোর্টিয়ামের সাথে যুক্ত হয়ে কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশন চালু করে।

📡 ৩. বাংলাদেশে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল ও ৫জি প্রযুক্তি (২০২৬)

  • SEA-ME-WE 6 ও বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল (BPCS):
    • উৎস: BSCCL অফিসিয়াল রিপোর্ট এবং BTRC (বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন) বিজ্ঞাপিত নীতিমালা ও নোটিফিকেশন।
    • তথ্য: সি-মি-উই ৬ ক্যাবল সংযোগের মাধ্যমে নতুন ব্যান্ডউইথ সংযোজন এবং বেসরকারী খাতের বিপিসিএস কনসোর্টিয়াম ও নোকিয়ার (Nokia) মধ্যে অবকাঠামোগত চুক্তি সংক্রান্ত প্রতিবেদন।
  • বাংলাদেশে ৫জি স্পেকট্রাম ও কভারেজ রিপোর্ট:
    • উৎস: BTRC Annual/Periodic Reports এবং মোবাইল অপারেটর (গ্রামীণফোন, রবি ও টেলিটক)-এর অফিসিয়াল নেটওয়ার্ক আপডেট।
    • তথ্য: দেশের প্রধান প্রধান বিভাগীয় শহর ও নির্দিষ্ট হটস্পটে ৫জি কভারেজ প্রদান এবং বিটিআরসি কর্তৃক হ্যান্ডসেট উৎপাদন সংক্রান্ত পরিসংখ্যান (যেখানে দেশের মোট চাহিদার অধিকাংশ এখনো ৪জি ও ফিচার ফোন নির্ভর)।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস

নিউজ ডেস্ক

November 7, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৭ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইতিহাস
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র (১৫শ খণ্ড), লে. কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ পিএসসির ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’, এবং সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাস ও সংবাদপত্র আর্কাইভস 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাস ছিল অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী, অস্থির এবং নাটকীয় পালাবদলের সময়। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে কয়েকটি সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে, যার চূড়ান্ত পরিণতি রূপ নেয় ৭ নভেম্বরের ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ বা ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি ও জনতার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধনে অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, যা বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক নতুন গতিপথে চালিত করে। এই ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল দিবসের নেপথ্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো। 

১. পটভূমি: ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর খোন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ায় সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধে। এর জেরে ৩ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের তৎকালীন সিনিয়র অফিসার ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং ঢাকা ওয়ান বেঙ্গলের কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে একটি পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। 

খালেদ মোশাররফের এই অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তাঁর পদ থেকে পদচ্যুত করা হয় এবং ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে তাঁকে সম্পূর্ণ গৃহবন্দি (House Arrest) করে রাখা হয়। খন্দকার মোশতাককে সরিয়ে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ৬ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করেন। 

২. নেপথ্যের অনুঘটক: জাসদ ও কর্নেল তাহেরের বিপ্লবের ডাক
মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের এই পাল্টা অভ্যুত্থানকে সেনাবাহিনীর সাধারণ জওয়ান বা সিপাহিদের একটি বড় অংশ ভারতের মদদপুষ্ট এবং মোশতাক চক্রের আরেকটি অংশের ক্ষমতার লড়াই হিসেবে চশমায় দেখছিল। এই সুযোগে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী দল ‘জাসদ’ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল)-এর সামরিক শাখা ‘গণবাহিনী’ এবং এর অন্যতম প্রধান নেতা লে. কর্নেল (অব.) আবু তাহের সেনানিবাসের সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে এক গোপন প্রচারণা চালান। 

কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ সিপাহিদের বৈষম্য দূরীকরণ, ১২ দফা দাবি আদায় এবং ‘শ্রেণিহীন সামরিক ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ল্যান্স নায়েক ও সুবেদারদের সংগঠিত করে। ৭ নভেম্বর ভোররাতে এক গণ-অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল বন্দি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসা, কারণ জিয়াউর রহমান সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। 

৩. ৭ নভেম্বরের সেই ভয়াল রাত এবং সিপাহি-জনতার জাগরণ
৬ নভেম্বর মধ্যরাত পার হয়ে ৭ নভেম্বর ভোররাতে (আনুমানিক রাত ১টা থেকে ২টার মধ্যে) ঢাকা সেনানিবাসে সিপাহিদের বিদ্রোহ আনুষ্ঠানিকভাবে ফেটে পড়ে। ট্যাংকের গর্জন এবং শত শত রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণের মাধ্যমে সিপাহিরা ব্যারাকে ব্যারাকে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। 

  • জিয়াউর রহমানের মুক্তি: সিপাহিদের একটি দল দ্রুত মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসভবনে যায় এবং পাহারারত সেন্ট্রিদের নিরস্ত্র করে তাঁকে অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত করে টু ফিল্ড আর্টিলারির সদর দপ্তরে নিয়ে আসে। মুক্ত হয়ে জিয়াউর রহমান সিপাহিদের শান্ত থাকার এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান। 
  • খালেদ মোশাররফের পতন ও মৃত্যু: সিপাহিদের এই ভয়াবহ বিদ্রোহের মুখে টিকতে না পেরে নবনিযুক্ত সেনাপ্রধান জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা এবং লে. কর্নেল এ টি এম হায়দার (যাঁরা সবাই বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন) শেরেবাংলা নগরের ১০ বেঙ্গলের সদর দপ্তরে আশ্রয় নেন। কিন্তু ৭ নভেম্বর সকালেই উত্তেজিত ও বিদ্রোহী সৈনিকদের হাতে এই তিন লিজেন্ডারি সামরিক কর্মকর্তা নির্মমভাবে নিহত হন। 
  • রাজপথে জনতার ঢল: সকাল হওয়ার সাথে সাথে সেনানিবাসের সিপাহিরা ট্রাকে করে, ট্যাংকের ওপর চড়ে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। তাদের মুখে স্লোগান ছিল—‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’, ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’। রাজপথের সাধারণ মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৈনিকদের সাথে যোগ দেয় এবং ফুলেল শুভেচ্ছা জানায়। সিপাহি ও জনতার এই অভূতপূর্ব সংহতির কারণেই দিনটিকে ইতিহাসে ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে অবিহিত করা হয়। 

৪. রাজনৈতিক তাৎপর্য ও পরবর্তী ফলাফল
৭ নভেম্বরের এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দেয়: 

  • জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার কেন্দ্রে আগমন: এই বিপ্লবের পর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহাল থাকলেও, জিয়াউর রহমান উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (Chief Deputy Martial Law Administrator) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং কার্যত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। 
  • কর্নেল তাহেরের সাথে দূরত্ব: সিপাহিদের ১২ দফা দাবি এবং জাসদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী ধারার সাথে জিয়ার শাসনতান্ত্রিক ও শৃঙ্খলা রক্ষাকারী চিন্তাভাবনার দূরত্ব তৈরি হয়। যার ফলে পরবর্তীতে কর্নেল তাহেরসহ জাসদের অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সামরিক আদালতে কর্নেল তাহেরের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। 


ইতিহাসের পাতা সবসময় একমুখী নয়। ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেমন একটি পক্ষ ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ বা ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে অত্যন্ত গৌরব ও শ্রদ্ধার সাথে উদ্‌যাপন করে, ঠিক তেমনই আরেকটি পক্ষ এই দিনটিকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে স্মরণ করে, কারণ এই দিন সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বহু বীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও জওয়ানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। গুগলের ২০২৬ সালের নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক কনটেন্ট নির্দেশিকা অনুযায়ী, তরুণ প্রজন্মের জন্য কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত ছাড়া এই দিবসের সকল পক্ষের বাস্তব প্রেক্ষাপট ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সঠিকভাবে অনুধাবন করা জরুরি। 

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

আধুনিক ও জটিল সমাজে মানসিক শান্তি ও সঠিক পথের সন্ধানে নবী-রাসূলদের আদর্শের গুরুত্ব অপরিসীম। জেনে নিন নবী রাসূলদের জীবনী থেকে শিক্ষা

নিউজ ডেস্ক

November 6, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৬ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইসলাম ও জীবন
তথ্যসূত্র: আল-কোরআনের তাফসির (তাফসির ইবনে কাসির), সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিস এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত নবী-রাসূলদের জীবনী গ্রন্থ। 

বর্তমান ২০২৬ সালের আধুনিক ও তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ যুগে মানুষ বাহ্যিক ও বস্তুগত দিক থেকে অনেক উন্নত হলেও, মানসিক প্রশান্তি, নৈতিকতা ও জীবনবোধের দিক থেকে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতি-ব্যবহার, পারস্পরিক দূরত্বের এই যুগে সঠিক জীবনদর্শনের অভাব স্পষ্ট। মানবজাতির হেদায়েত ও সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে যে নবী-রাসূলদের পাঠিয়েছেন, তাদের জীবন কেবল ইতিহাসের কিছু গল্প নয়; বরং তা কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য এক জীবন্ত ও কালজয়ী গাইডলাইন। এই বিশেষ সিরিজের ১ম পর্বে আমরা আলোচনা করব নবী-রাসূলদের অনন্য জীবন থেকে আজকের দিনে আমাদের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার মতো ৩টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। 

১. হযরত আইয়ুব (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা: চরম বিপদেও মানসিক শক্তি ও ধৈর্য (Patience)
আজকের যুগে সামান্য আর্থিক ক্ষতি, চাকরি হারানো কিংবা পারিবারিক বা শারীরিক অসুস্থতায় মানুষ দ্রুত হতাশ হয়ে পড়ে, এমনকি অনেকে আত্মহননের পথও বেছে নেয়। এই মানসিক সংকটে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় আদর্শ হলেন হযরত আইয়ুব (আ.)। 

আল্লাহ তাআলা তাঁকে দীর্ঘ বছর ধরে কঠিন রোগ, সন্তানদের মৃত্যু এবং সমস্ত ধন-সম্পদ হারানোর মাধ্যমে পরীক্ষা করেছিলেন। কিন্তু এমন চরম সংকটেও তিনি আল্লাহর প্রতি বিন্দুমাত্র অভিযোগ করেননি, বরং চরম ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন। 

  • আজকের দিনের শিক্ষা: আধুনিক জীবনে বিষণ্ণতা (Depression) বা যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে ভেঙে না পড়ে ইতিবাচক থাকা এবং বিশ্বাস রাখা যে—কষ্টের পরেই স্বস্তি আসে। বিপদে অধৈর্য না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখাই হলো সফলতার মূল চাবি। 

২. হযরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা: নৈতিক স্খলন ও প্রলোভন থেকে নিজেকে রক্ষা করা (Self-Control)
বর্তমান ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক মাধ্যমের উন্মুক্ততার কারণে তরুণ প্রজন্মের সামনে পর্নোগ্রাফি, অবৈধ সম্পর্ক এবং নৈতিক স্খলনের নানামুখী প্রলোভন প্রতিনিয়ত আসছে। নিজের চরিত্র ও নৈতিকতা ধরে রাখা আজকের দিনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। 

হযরত ইউসুফ (আ.) ছিলেন অপরূপ সুন্দর এবং যুবক। মিশরের আজিজের স্ত্রী যখন ঘরের সমস্ত দরজা বন্ধ করে উনাকে পাপের দিকে আহ্বান করেছিল, তখন তিনি সমস্ত প্রলোভন ও ক্ষমতার দাপটকে তুচ্ছ করে বলেছিলেন, “আমি আল্লাহর আশ্রয় চাচ্ছি।” পাপের চেয়ে তিনি কারাগারের বন্দিজীবনকে বেছে নিয়েছিলেন। 

  • আজকের দিনের শিক্ষা: চারপাশে যত বড় বা সহজ প্রলোভনই থাকুক না কেন, আল্লাহর ভয়কে অন্তরে জাগ্রত রেখে নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ (Self-Control) বজায় রাখা। ক্যারিয়ার বা জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে সাময়িক আনন্দের চেয়ে চিরস্থায়ী নৈতিকতা ও সততাকে প্রাধান্য দেওয়া। 

৩. হযরত নূহ (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা: সামাজিক সমালোচনা উপেক্ষা করে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকা (Perseverance)
আজকের দিনে তরুণ বা উদ্যোক্তারা যখন নতুন বা ভালো কোনো কাজ করতে যায়, তখন সমাজের মানুষের সমালোচনা, ট্রল বা উপহাসের শিকার হয়ে অনেকেই মাঝপথে কাজ ছেড়ে দেয়। মানুষের কথা বা সামাজিক চাপের মুখে নিজের সৎ লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া খুবই সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

হযরত নূহ (আ.) যখন আল্লাহর নির্দেশে মরুভূমির বুকে বিশাল নৌকা তৈরি করছিলেন, তখন সমকালীন সমাজের মানুষ উনাকে দেখে চরম উপহাস করত, পাগল বলত। কিন্তু তিনি মানুষের কোনো উপহাস বা ট্রলের দিকে কান না দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই নৌকাই বিশ্বাসীদের রক্ষা করেছিল। 

  • আজকের দিনের শিক্ষা: আপনি যদি নিশ্চিত হন যে আপনার কাজটি সৎ, সঠিক এবং মানবকল্যাণকর, তবে সমাজ বা সোশ্যাল মিডিয়ার মানুষ কী বলল বা কী ট্রল করল—তাতে কান না দিয়ে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকা। দৃঢ় সংকল্প এবং কঠোর পরিশ্রমই শেষ পর্যন্ত সত্যকে জয়ী করে। 


নবী-রাসূলদের এই চমৎকার ঐতিহাসিক শিক্ষাগুলো কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং আমাদের প্রতিদিনের আচরণ, কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক জীবনে চর্চা করা উচিত। তবেই আমরা এই আধুনিক ও জটিল পৃথিবীতে একটি শান্তিপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গড়ে তুলতে সক্ষম হব। 

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

বিকাশ

নিউজ ডেস্ক

November 6, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৬ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ডিজিটাল ও সাইবার জগৎ
তথ্যসূত্র: বিকাশ (bKash) সিকিউরিটি গাইডলাইন, বাংলাদেশ ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) এবং সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন (ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ) 

ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার সাথে সাথে অনলাইন শপিং এবং মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ) আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এই সুবিধার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অভিনব সব সাইবার জালিয়াতি ও প্রতারণা। প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষ বিভিন্ন লোভনীয় অফার বা চতুর ফিশিংয়ের ফাঁদে পড়ে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ও বিকাশ অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন। গুগলের ২০২৬ সালের সর্বশেষ ইউজার সেফটি ও সিকিউরিটি গাইডলাইন অনুযায়ী, অনলাইন শপিং ও বিকাশ ব্যবহার করার সময় জালিয়াতি চক্রকে ধরার ৭টি পাকা ও প্রমাণিত উপায় নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো: 

১. অস্বাভাবিক মূল্যছাড় এবং “অবাস্তব” অফার (Too Good to be True)
প্রতারক চক্রের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো লোভ। বাজারে যে প্রোডাক্টটির আসল দাম ৫,০০০ টাকা, কোনো পেজ বা ওয়েবসাইটে যদি সেটি মাত্র ১,৫০০ টাকায় ‘অফারের’ নামে বিক্রি করার বিজ্ঞাপন দেখেন, তবে শুরুতেই সতর্ক হন। আইফোন, প্রিমিয়াম গ্যাজেট বা ব্র্যন্ডেড পোশাকের ক্ষেত্রে এই ধরনের অবাস্তব ছাড় মূলত ক্রেতাদের ফাঁদে ফেলার প্রথম ধাপ। 

২. শুধু ‘অ্যাডভান্স ফুল পেমেন্ট’ বা অগ্রিম টাকা নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া
বিশ্বস্ত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো সবসময় ক্যাশ অন ডেলিভারি (COD) বা কন্ডিশনাল ডেলিভারির সুবিধা দেয়। কিন্তু কোনো নতুন বা স্বল্প পরিচিত পেজ যদি পণ্য ডেলিভারি দেওয়ার আগেই বিকাশের মাধ্যমে সম্পূর্ণ টাকা বা অতিরিক্ত ডেলিভারি চার্জ অগ্রিম পরিশোধ করার জন্য অনবরত চাপ দিতে থাকে, তবে বুঝতে হবে এখানে বড় ধরনের গড়মিল রয়েছে। নির্ভরযোগ্য কোনো প্রতিষ্ঠান কাস্টমারকে পেমেন্টের জন্য বারবার তাগাদা দেয় না। 

৩. ভুয়া বিকাশ কল এবং পিন/ওটিপি (PIN/OTP) চাওয়া
বিকাশ প্রতারণার অন্যতম সাধারণ পদ্ধতি হলো গ্রাহককে ফোন করে বলা যে, “আমি বিকাশ অফিস থেকে বলছি, আপনার অ্যাকাউন্টটি ব্লক হয়ে গেছে” অথবা “ভুল করে আপনার অ্যাকাউন্টে টাকা চলে গেছে, ওটিপি (OTP) কোডটি বলুন।” মনে রাখবেন, বিকাশের কোনো কর্মকর্তা বা কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধি কখনোই আপনার ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (OTP) কিংবা ৪ বা ৫ ডিজিটের গোপন পিন (PIN) নম্বর জানতে চাইবে না। কেউ এটি চাইলেই নিশ্চিতভাবে সে একজন প্রতারক। 

৪. ভুয়া এসএমএস (Fake SMS) ও স্পুফিং লিংকের ব্যবহার
অনেক সময় প্রতারকেরা হুবহু বিকাশের মেসেজ ফরম্যাট নকল করে আপনার ফোনে বার্তা পাঠায়, যাতে লেখা থাকে “You have received TK. 5,000″। এই মেসেজগুলো কিন্তু আপনার আসল বিকাশ অ্যাপের ব্যালেন্স বাড়ায় না। এছাড়া ‘বিকাশ বোনাস’ বা ‘সরকারি অনুদান’ পাওয়ার লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন ফিশিং লিংক পাঠানো হয়। কোনো লিংকে ক্লিক করে আপনার বিকাশ নম্বর এবং পিন সাবমিট করার আগে অবশ্যই ওয়েবসাইটের ইউআরএল (URL) চেক করুন। বিকাশের আসল ওয়েবসাইট লিংক সবসময় https://www.bkash.com/ দিয়ে শুরু হয়। 

৫. ফেসবুক পেজের লাইক, কমেন্ট ও রিভিউ সেকশন হাইড বা অফ থাকা
অনলাইন শপিং পেজটি আসল নাকি নকল তা চেনার একটি সহজ উপায় হলো তাদের রিভিউ সেকশন। প্রতারক চক্রের পেজগুলোতে সাধারণত কাস্টমার রিভিউ অপশন বন্ধ থাকে এবং পোস্টের কমেন্ট সেকশন হাইড (Hide) বা লিমিটেড করা থাকে, যাতে প্রতারিত হওয়া অন্য ভুক্তভোগীরা সেখানে নেতিবাচক মন্তব্য করতে না পারেন। এছাড়া পেজের ‘Page Transparency’ অপশনে গিয়ে পেজটি কবে তৈরি হয়েছে এবং এর আগে কতবার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে তা দেখে এর নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা যায়। 

৬. ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে (Personal Number) ‘সেন্ড মানি’ করার তাগিদ
যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রফেশনাল অনলাইন শপের নিজস্ব ‘বিকাশ মার্চেন্ট’ (Merchant Account) অ্যাকাউন্ট থাকে, যেখানে গ্রাহক ‘মেক পেমেন্ট’ অপশন ব্যবহার করে কেনাকাটা করেন। কিন্তু বিক্রেতা যদি কোনো মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট না দেখিয়ে আপনাকে বারবার পার্সোনাল নম্বরে ‘সেন্ড মানি’ বা ‘ক্যাশ ইন’ করতে বলে, তবে সাবধান হোন। পার্সোনাল নম্বরে টাকা পাঠালে পরবর্তীতে প্রতারণার শিকার হলেও সেই টাকা ট্র্যাক করা বা রিফান্ড পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। 

৭. লাইভ চ্যাটে ফেসবুক আইডির সত্যতা এবং ট্র্যাকিং আইডি না দেওয়া
পণ্য অর্ডার করার পর যদি তারা কোনো কুরিয়ার সার্ভিসের (যেমন- সুন্দরবন, স্টিডফাস্ট, পাথao) মেমো বা ট্র্যাকিং আইডি দিতে টালবাহানা করে অথবা বারবার কুরিয়ারে বুকিং দেওয়ার নাম করে অতিরিক্ত ‘প্রসেসিং ফি’ দাবি করে, তবে ধরে নেবেন আপনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। জালিয়াতি চক্র সাধারণত টাকা পাওয়ার পরপরই গ্রাহকের ফেসবুক আইডি বা ফোন নম্বর ব্লক করে দেয়। 

প্রতারিত হলে তাৎক্ষণিক করণীয় ও আইনি প্রতিকার:
১. বিকাশ হেল্পলাইন ১৬২৪৭: যদি ভুলবশত কোনো প্রতারককে টাকা পাঠিয়ে দেন বা ওটিপি শেয়ার করে ফেলেন, তবে এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে সরাসরি বিকাশের হটলাইন নম্বর ১৬২৪৭-এ কল করে আপনার অ্যাকাউন্টটি সাময়িকভাবে লক করুন এবং যে নম্বরে টাকা গেছে সেটি রিপোর্ট করুন।
২. জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (DNCRP): অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারিত হলে মেমো, চ্যাটের স্ক্রিনশট এবং পেমেন্ট প্রুফসহ ভোক্তা অধিকারে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেন।
৩. সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন: বিকাশ বা অনলাইন শপিং জালিয়াতির শিকার হলে নিকটস্থ থানায় জিডি (GD) করুন এবং ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিটের ফেসবুক পেজে বা সরাসরি হ্যালো সিটি (Hello CT) অ্যাপের মাধ্যমে অভিযোগ জানান। ডিজিটাল সিকিউরিটি ও সাইবার ক্রাইম টিম এই ধরনের অপরাধীদের আইপি ও লোকেশন ট্র্যাক করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে সক্ষম। 

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

২৩শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ