ইতিহাস
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ঐতিহাসিক প্রতিবেদক | ৩০ এপ্রিল ২০২৬
সময়টা তখন ১৯৪৭ এর দিকে। মৃত সাগরের উত্তর-পশ্চিম তীর ঘেঁষে অবস্থিত কুমরান গুহা। এই গুহাতেই পাথর নিক্ষেপ করার খেলায় মত্ত দুই বেদুইন বালক। মেষ চড়ানোর বায়না ধরে প্রায়ই এদিকটায় চলে আসে দুই ভাই মিলে। হঠাৎ বড় একটা পাথর ছোঁড়ার পর অদ্ভুত রকমের শব্দ হলো। প্রথমদিকে তারা মনের ভুল ভেবে উড়িয়ে দিলেও, প্রতিটি পাথর নিক্ষেপের পর একই রকম শব্দ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল মাটির তৈরি কিছু একটা ভেঙে গেছে। দুই বালক খেলা থেমে চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়লো।
বাতাসে ভেসে আসা মৃত সাগরের লোনা গন্ধ আর পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়া বিকেলের সূর্য চারিদিক করে তুলেছিল রহস্যময়। তখনো সন্ধ্যা হতে অনেক দেরি। তাই এই অদ্ভুত শব্দের উৎস জানার জন্য দুজনে মিলে ঢুকে পড়লো গুহার ভেতর।
সেদিন সেই দুই বালকের সাহসী পদক্ষেপ উন্মোচন করে দিল এক গুপ্ত ইতিহাস। তারা গুহার ভেতর প্রবেশ করে উদ্ধার করলো বড় বড় মাটির পাত্র। পাত্র গুলো উল্টে দিতেই মাটিতে ছড়িয়ে পড়লো অগণিত চামড়ার তৈরি স্ক্রোল। এরকম প্রায় ৭টি বড় পাত্র ভর্তি স্ক্রোল উদ্ধার করলো দুজন মিলে। তখন বাইরের আকাশে সূর্য প্রায় অস্ত যাই-যাই করছে। দুই বালক ছুটে চলে গেল বেদুইন পল্লীর দিকে। চিৎকার করতে লাগলো হাত-পা ছুঁড়ে, “গুপ্তধন! গুপ্তধন!”
বেদুইন সর্দার সব শুনে রাতটা অপেক্ষা করলেন। পরদিন ভোর হতেই দলে দলে কুমরান গুহাতে হানা দিলেন। উদ্ধার করে নিয়ে আসলেন শত শত স্ক্রোল। আশেপাশের সব গুহাতে তল্লাশী চালানো যখন শেষ, তখন বেদুইনদের ঝুলিতে স্ক্রোলের সংখ্যা ৯০০ ছুঁই ছুঁই করছে। জেরুজালেমে তীর্থের উদ্দেশ্যে অনেক মানুষ জড়ো হতেন। এই খবর চারিদিকে ছড়িয়ে গেলে সবাই বেদুইন পল্লীতে ছুটে আসলেন। এভাবেই মানবসভ্যতার চোখের আড়াল হয়ে থাকা রহস্যময় ডেড সী স্ক্রোল নতুন করে ফিরে আসলো আমাদের মাঝে; সাথে নিয়ে এলো এক অজানা ইতিহাস!
সেই দুই বেদুইন, যারা বাল্যকালে খেলার সময় স্ক্রোলগুলো উদ্ধার করেন।
ডেড সী স্ক্রোল কী?
‘ডেড সী স্ক্রোল’ নাম শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে উঠে বিখ্যাত মৃত সাগরের ছবি। নামকরণ থেকে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, স্ক্রোলগুলো সম্ভবত মৃত সাগর থেকে উদ্ধারকৃত অথবা এর সাথে কোন যোগসূত্রতা রয়েছে। কিন্তু এই স্ক্রোলগুলোর নাম প্রথমদিকে ডেড সী স্ক্রোল ছিল না। প্রথমে একে ‘কুমরান গুহার স্ক্রোল’ নামে ডাকা হলেও এর অনুসন্ধানস্থল সকল গুহা মৃত সাগরের তীর ঘেষে অবস্থিত হওয়ায় এর নাম হয়ে যায় ‘ডেড সী স্ক্রোল’।
কুমরান গুহা থেকে অদূরেই অবস্থিত মৃত সাগর দিগন্তের সাথে মিশে আছে।
প্যাপিরাস পাতার তৈরি শক্ত কাগজ এবং বুনো শূকরের চামড়ার উপর গাঢ় কালি দিয়ে লেখা স্ক্রোলগুলো গুহার আঁধার থেকে স্থান পেল প্রত্নতাত্ত্বিকদের গবেষণাগারে। ততদিনে এতটুকু জানা হয়ে গেছে যে, স্ক্রোলগুলো অতিপ্রাচীন হিব্রু-বাইবেলের পান্ডুলিপি যা হিব্রু, আরমানি আর গ্রিক ভাষায় লেখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত বাইবেলের মধ্যে এই স্ক্রোলগুলো প্রাচীনতম।
এখানে জানিয়ে রাখা ভালো, ‘হিব্রু-বাইবেল’ দ্বারা ইহুদি গ্রন্থ তানাখ এর শিপারা এবং খ্রিস্টান ওল্ড টেস্টামেন্টের আনুশাসনিক বাণী সম্বলিত পান্ডুলিপিকে বুঝায়।
তখন এর পাঠোদ্ধারের পাশাপাশি চলছিল নানান জল্পনা-কল্পনা। কে বা কারা এই স্ক্রোলগুলো এই গুহাতে লুকিয়ে রেখেছে? কেন রেখেছে? স্ক্রোলগুলো কি শুধু হিব্রু-বাইবেলেরই অংশ? নাকি রোমাঞ্চকর কিছু লুকিয়ে আছে এর মাঝে?
প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান
প্রথমদিকে বেদুইনরাই ছিলেন একমাত্র অনুসন্ধানকারী। ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তারাই সকল স্ক্রোল উদ্ধার করেন। বেদুইনদের কাছে স্ক্রোলগুলো ছিল আয়-উপার্জনের মাধ্যম। তারা শিক্ষিত না হলেও এতটুকু নিশ্চিত ছিলেন যে, এই ধুলিমাখা ছেঁড়া পান্ডুলিপি তাদের কাছে মূল্যহীন হলেও গণ্যমান্য সাহেবরা চড়াদামে কিনে নিবেন। তাদের এই ব্যবসাতে প্রথম হস্তক্ষেপ করে জর্ডানের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ।
তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান ল্যাঙ্কেস্টার হার্দিং সকল স্ক্রোল জর্ডান সরকারের অধীনে আনার লক্ষ্যে অভিযান পরিচালনা করেন। সরকারি অর্থায়নে অনুসন্ধান পুরোদমে চলছিল। কিন্তু বেদুইনরাও থেমে যাননি। তারাও তাদের অনুসন্ধান অব্যাহত রাখেন।
১৯৫১ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত জর্ডান সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক অনুসন্ধান করেন ফরাসী ধর্মযাজক ফাদার রলা দ্য ভুঁ। তিনি সর্বমোট ১১টি গুহা চিহ্নিত করেন এবং এর উৎপত্তিস্থল, মালিকানা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণায় ভূমিকা পালন করেন। ১১টি গুহার মধ্যে ৫টি গুহার বেশিরভাগ স্ক্রোলই তখন বেদুইনদের দখলে ছিল। তারা সেগুলো বিভিন্ন দেশের হিব্রু যাজক এবং ইসরাইলিদের কাছে বিক্রয় করে দেন।
মার স্যামুয়েল এর সেই বিজ্ঞপ্তি।
এর মধ্যে সিরিয়ান বিশপ মার স্যামুয়েল তার ক্রয়কৃত চারটি স্ক্রোল ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে বিক্রয়ের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। এই বিজ্ঞপ্তি ইসরাইলি সামরিক বাহিনী প্রধান ইয়েগাল ইদিনের নজরে আসে। তার পিতা এল সুকেনিক ছিলেন হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য অধ্যাপক। তিনি ২৫০,০০০ ডলারের বিনিময়ে সেগুলো কিনে নেন। এর পরেই ইসরাইল এবং জর্ডান পৃথক পৃথকভাবে এই স্ক্রোল নিয়ে গবেষণায় নেমে পড়ে।
স্ক্রোল গবেষণায় মগ্ন অধ্যাপক সুকেনিক।
প্রাথমিক প্রশ্নোত্তরের খোঁজে
গবেষকদের প্রথম লক্ষ্য ছিল অতি দ্রুত কিছু প্রাথমিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা। স্বাভাবিকভাবেই তখন সকলের মনে কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, কে বা কারা এই স্ক্রোলগুলো এখানে রেখে গেল? কখন লেখা হয়েছিল এই স্ক্রোলগুলো? কী লেখা আছে সেখানে?
এই সব প্রশ্নের উত্তর বের করার ক্ষেত্রে প্রথম সফলতার মুখ দেখেন ইসরাইলি অধ্যাপক সুকেনিক। তিনি এগুলোর বয়স বের করতে সক্ষম হন। তিনি বলেন, ইহুদিদের ঐতিহাসিক দ্বিতীয় মন্দির যুগে প্রথম লেখা হয় এই স্ক্রোলগুলো। তবে অন্য বিজ্ঞানীরা এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও পরবর্তীতে সুকেনিকের তথ্য সত্য বলে মেনে নেন সবাই। সেই অনুযায়ী সময়টা খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতাব্দী থেকে ১০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। অবাক করা ব্যাপার হলেও সত্য, আধুনিক যুগে কার্বন ডেটিং এর ফলাফলও সুকেনিকের অনুমানকে সমর্থন করে।
কিন্তু কারা এই পাণ্ডুলিপিগুলো সংকলন করেছিলেন, এ নিয়ে এখন পর্যন্ত বিতর্কে লিপ্ত আছেন গবেষকরা। অনেকের মতে, রোমান বাহিনীর হাতে কুমরান এলাকা পতনের পূর্বে এখানে বসবাসরত ইহুদিদের দ্বারা এগুলো সংকলিত। তখন ইহুদিদের চারটি বড় গোত্রের মধ্যে ইসেন সম্প্রদায়ের পণ্ডিতগণ এগুলো সংকলন করেন বলে ধারণা করা হয়। রোমানদের আক্রমণের পর সেগুলো এই গুহার মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয় এবং এটাকে ‘মিনি পাঠাগার’ হিসেবে ব্যবহার করেন ইহুদি ধর্মানুসারীরা।
মহামূল্যবান ডেড সী স্ক্রলের একটি পাণ্ডূলিপি।
এছাড়া বাকি গোত্রদেরও বাদ দেয়া হয়নি সম্ভাব্য সংকলকের তালিকা থেকে। আবার অনেকের মতে, এগুলো সকলের সম্মিলিত প্রয়াস। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো মেলেনি।
ইসরাইল বিতর্ক এবং স্ক্রোলের পাঠোদ্ধার
বেদুইনদের ব্যবসার সুবাদে ততদিনে স্ক্রোল ছড়িয়ে গেছে বিভিন্ন দেশের গবেষকদের কাছে। যদিও সিংহভাগ স্ক্রোল জর্ডান এবং ইসরাইলের হস্তগত ছিল, কিন্তু বাকিরাও হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন না। বড় বড় গবেষকরা বিভিন্ন তথ্য উদ্ধার করতে লাগলেন স্ক্রোল ঘেঁটে।
তবে সেগুলো একই তথ্য বিভিন্ন রূপে জানানো ছাড়া তেমন কোন ঝড় তুলতে পারেনি বিশ্ব দরবারে। এক্ষেত্রে ইসরাইলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন সবাই।
অপরদিকে ইসরাইলে তখন গবেষকদের মধ্যে প্রশাসনিক কারণে কলহ চলছিল। ড. জন স্ত্রাঙ্গলের নেতৃত্বে হাতেগোণা কয়েকজন গবেষক ছাড়া আর কেউ স্ক্রোল নিয়ে কাজ করার অনুমতি পাননি। এমনকি স্ক্রোল সম্পর্কিত আলোকচিত্র প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও ছিল কড়াকড়ি। ১৯৭৭ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গেজা ভারমেস এটাকে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় একাডেমিক কেলেঙ্কারি বলেন।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পাঠোদ্ধার করছেন এক তরুণ গবেষক।
তৎকালীন শীর্ষ গবেষক হার্শেল শ্যাঙ্কস প্রায় তিন দশক ধরে এ নিয়ে আইনী লড়াই করেন। দীর্ঘদিনের লড়াই শেষে ১৯৯১ সালে ইসরাইলের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগীয় প্রধান ইমানুয়েল তভ সর্বপ্রথম স্ক্রোল গবেষণার ফল এবং পাণ্ডুলিপি অন্যান্য দেশের বিজ্ঞানীদের জন্য উন্মুক্ত ঘোষণা করেন।
এরপর ঝিমিয়ে পড়া গবেষকদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা দেখা গেল। কাজে লেগে পড়লেন সবাই। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বদৌলতে দ্রুত বেশিরভাগ পাণ্ডুলিপির পাঠ পুনরোদ্ধার সম্ভব হলো। এক এক করে প্রকাশিত হতে থাকলো সকল স্ক্রোলের মার্জিত পাণ্ডুলিপি।
সমস্ত পাণ্ডুলিপিকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়- বাইবেলিক এবং নন-বাইবেলিক। এর মধ্যে ১০ কপি ঈসায়ী, ৩০ কপি শামের কিতাব এবং ২৫ কপি দ্বিতীয় বিবরণ সম্পর্কিত হিব্রু দলিল রয়েছে। গবেষকদের মতে, স্ক্রোলগুলো মূলত হিব্রু বাইবেলের পান্ডুলিপি হলেও সম্পূর্ণ বাইবেলের The Book of Esther অধ্যায়ের কোনো পান্ডুলিপি এর মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
নতুন টেস্টামেন্টের ঈসায়ী থেকে এগুলো ১০০০ বছর পুরাতন। তবে যিশুখ্রিস্টের আগমনবার্তা সম্পর্কিত জশুয়ার ভবিষ্যদ্বাণী হিব্রু শামের কিতাবে রয়েছে, যা এর আগে কোথাও দেখা যায়নি। ওল্ড টেস্টামেন্টের অনেক দূর্লভ ও হারিয়ে যাওয়া তথ্য এই স্ক্রোলের মাধ্যমে জানা সম্ভব হয়েছে। এ থেকে অনেকে ধারণা করেন, খ্রিস্টধর্মের শুরু হয়েছে এই স্ক্রোলগুলোর মাধ্যমে। তবে এই বিষয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ বিতর্ক চললেও সঠিকভাবে কোন কিছু জানা যায়নি।
আর নন-বাইবেলিক অংশে বিভিন্ন আইন-কানুন, রীতিনীতি, ব্যবসায়িক কাগজপত্র এবং কিছু ব্যক্তিগত পুঁথি রয়েছে। গবেষকদের মতে, কুমরান গুহার বিরানভূমি আগে ঠিক এরকম ছিল না। এখানে বড় সম্প্রদায় বাস করতো। কুমরান নামে গোটা একটা সভ্যতার অস্তিত্বের কথা জানা যায় স্ক্রোল থেকে।
এছাড়া ১৬টি সামরিক চিঠিপত্র পাওয়া যায়, যেগুলো বার কুখবা নামে পরিচিত। ‘বাবাথা’ নামক এক ইহুদির ব্যক্তিগত নথি সম্বলিত কয়েকটি পাণ্ডুলিপিও পাওয়া যায়। নব্যপ্রস্তর যুগের বিভিন্ন হাতিয়ারের অংশবিশেষও উদ্ধার করা হয় বলে জানান গবেষকরা।
প্রায় ৪০% এর মতো স্ক্রোল থেকে পাঠোদ্ধার করা অসম্ভব বলে জানান ইসরাইলি গবেষকগণ। ১৯৯১ সালের নভেম্বর মাসে Biblical Archaeological Society প্রথমবারের মতো পাণ্ডুলিপি বিষয়ক প্রদর্শনীর আয়োজন করে। তবে ১৯৯৪ এর শেষের দিকে ইসরাইলি পুরাতত্ত্ববিদরা পরীক্ষার মাধ্যমে কিছু গ্রিক পাণ্ডুলিপি কুমরান সম্প্রদায় বহির্ভুত বলে নিশ্চিত হন। তবে সেগুলো ঠিক কোন উদ্দেশ্যে সেখানে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল, তার উত্তর এখনো বের করা সম্ভব হয়নি।
সতর্কতার সাথে ভেঙে যাওয়া অংশ জোড়া লাগানো হচ্ছে।
ইসরাইল প্রদত্ত ছবি নিয়ে হান্টিংটন লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ প্রথম কম্পিউটার অ্যানালাইসিস সম্পাদন করেন। এর মাধ্যমে দুর্বোধ্য অনেক পাণ্ডুলিপির নিখোঁজ অংশের সম্ভাব্য পাঠোদ্ধার সম্পন্ন করা হয়।
ডেড সী স্ক্রোলের পাঠোদ্ধারের মাধ্যমে ওল্ড টেস্টামেন্টের অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসে, যা র্যাবাই তত্ত্ব এবং জুডাতত্ত্বের নতুন দিক উন্মোচন করে। যিশুখ্রিস্টের আগমন এবং প্রাথমিক খ্রিস্টান ধর্মের অনেক অজানা তথ্যও জানা যায়। প্রাচীন ইহুদি ধর্মের সাথে খ্রিস্টানদের ওল্ড টেস্টামেন্ট এর সূক্ষ যোগসূত্রতাও পাওয়া যায় এগুলো থেকে।
রহস্যময় কপার স্ক্রোল এবং গুপ্তধনের সন্ধান
ধর্মীয় স্ক্রোলগুলো ইসরাইলিদের হাতে থাকলেও সবচেয়ে রহস্যময় স্ক্রোল তখন জর্ডানীদের হস্তগত ছিল। অন্যান্য স্ক্রোলের মতো তা প্যাপিরাস পাতা বা চামড়ার উপর লিখিত ছিল না। সেটা লেখা হয়েছিল তামার তৈরি পাতের উপর। যাকে ইতিহাসবিদগণ The Copper Scroll নামে চিনেন
একে পাণ্ডুলিপি বললেও ভুল হবে। কারণ এর মাঝে লেখার সাথে আছে খোদাই করা কয়েকটি মানচিত্র। আসলে এটা ছিল একাধিক গুপ্তধনের নকশা। ১৯৫২ সালে অনুসন্ধান অভিযানের সময় এক জর্ডানী পুরাতত্ত্ববিদ ৩ নং গুহার ভেতর থেকে এটি উদ্ধার করেন।
জাদুঘরে কাঁচের ক্যাবিনেটে রক্ষিত রহস্যময় কপার স্ক্রোল।
জর্ডান সরকার তখন কড়া নিরাপত্তায় স্ক্রোলটিকে ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যালেগ্রো-এর নিকট প্রেরণ করেন। অ্যালেগ্রো পরীক্ষার মাধ্যমে বুঝতে পারেন স্ক্রোলটি একটি গুপ্তধনের মানচিত্র। তিনি তৎক্ষণাৎ স্ক্রোলের রহস্য সমাধানে লেগে যান। পরবর্তীতে জর্ডান সরকারের নির্দেশে ১৯৬০ সালে অ্যালেগ্রোর গবেষণার ফলাফল জার্নাল আকারে প্রকাশ করা হয়।
অ্যালেগ্রোর জার্নালে ঢুঁ মেরে জানা যায় যে, স্ক্রলে মোট ৬৩ টি স্থানের নির্দেশনা রয়েছে। স্ক্রোলের ভাষ্যমতে সেগুলো সোনা আর রুপা বোঝাই করা কুঠুরি, যার সর্বমোট পরিমাণ কয়েক টনের কাছাকাছিও যেতে পারে। স্ক্রোলটি যেন বছরের পর বছর টিকে থাকে সেজন্য এটা তামার পাতের উপর লেখা হয় বলে জানান অ্যালেগ্রো।
স্ক্রোলের নির্দেশনায় স্পষ্টাকারে স্থানগুলোর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। কপার স্ক্রোল থেকে হুবহু অনুবাদ করা আলোচিত একটি লাইন তুলে ধরলাম, “যেখানে লবণের স্তূপ, সেখান থেকে প্রথম সিঁড়ির নিচে চার হাত গভীরে ৪১ টালি রূপা”।
আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে সহজ মনে হলেও গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়া এতো সহজ নয়। কারণ, মানচিত্রের এসব নির্দেশনা তখনকার গুহাবাসীদের জন্য লেখা হয়েছিল। কেউ নিজের ঘরের মতো গুহাগুলোকে না চিনলে, তার পক্ষে এই অবস্থানগুলো বের করা প্রায় অসম্ভব। তাই, এখনকার কারো জন্য এত সহজ নয় এর সন্ধান করা। উপরন্তু স্ক্রোল মোতাবেক গুপ্তধনের প্রথম অবস্থানের সাথে বাকিগুলোর যোগসূত্র রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই প্রথম অবস্থানই বের করা সম্ভব হয়ে উঠেনি
কপার স্ক্রোলের একাংশ।
তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে, দুই হাজার বছর আগেই রোমানরা হয়তো সকল গুপ্তধন লুট করে ফেলেছেন। এর পক্ষে প্রমাণও দিয়েছেন অনেকেই। কিন্তু এই প্রমাণ কি আর অনুসন্ধান থামাতে পারে! এখনো সবধরনের সূত্র নিয়ে পরীক্ষা করে যাচ্ছেন পুরাতত্ত্ববিদরা।
আর এই মহামূল্যবান কপার স্ক্রোল নিয়ে সাহিত্যকরাও মনের মাধুরী মিশিয়ে আপন কল্পনার মাধ্যমে রোমাঞ্চকর অভিযান পরিচালনা করে রচনা করেছেন বেশ কিছু উপন্যাস। এর মধ্যে Nathaniel Norsen Weinreb এর The Copper Scroll এবং Lionel Davidson এর A long way to Shiloh বিখ্যাত।
মালিকানা বিরোধ
প্রথমদিকে ধর্মীয় স্ক্রোল মনে হলেও কপার স্ক্রোলের সন্ধান আরো রোমাঞ্চকর রহস্যের হাতছানি দিচ্ছে ইতিহাসবিদদের। এরই জের ধরে ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় ইসরাইল জর্ডান থেকে প্রায় ১৫০০ এর মতো স্ক্রোল নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। ইসরাইলের রকফেলার জাদুঘরে কড়া নিরাপত্তায় শুরু হয় গবেষণা।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক শুরু হয় যখন ইসরাইল স্ক্রোলগুলোর অনুবাদ প্রকাশ করতে দীর্ঘ ৪০ বছর বিলম্ব করে। এদিকে জর্ডান সরকারও বসে থাকেনি। তারাও বরাবরই জর্ডানকে স্ক্রোলগুলোর বৈধ মালিক হিসেবে দাবি করে আসছে।
কানাডায় ডেড সী স্ক্রোল প্রদর্শনীর একটি কেবিনেট।
বর্তমানে জর্ডানের দখলে রয়েছে কপার স্ক্রোলসহ মাত্র ২৫টি স্ক্রোল! এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফিলিস্তিন, কানাডা এবং সিরিয়ার বিভিন্ন গবেষণাগার এবং প্রতিষ্ঠানের নিকট বেশ কয়েকটি স্ক্রোল হস্তগত আছে।
অপরদিকে সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘ নিরাপত্তা নীতির ২৩৩৪ অনুশাসনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র Veto প্রদান না করায়, ইসরাইল স্ক্রোলগুলোর অধিকার হারাতে পারেন বলে মনে করেন টাইমস অফ ইসরাইলের বিশেষজ্ঞরা। তবে স্ক্রোলের ব্যাপারে ইসরাইলের মাত্রাতিরিক্ত গোপনীয়তা ব্যাপারটিকে রহস্যময় করে তুলেছে।
২০১০ সালে জর্ডান সরকার কানাডায় ইসরাইল আয়োজিত স্ক্রোল প্রদর্শনী বয়কট করে এবং সেগুলো পুনরায় দখলে নেওয়ার সংকল্প জানায়। বর্তমানে জর্ডান, ইসরাইল , ফিলিস্তিন , কানাডা এবং সিরিয়া স্ক্রোলগুলোর মালিকানার বিষয়ে স্নায়ুযুদ্ধে লিপ্ত আছে, যা সমাধা হওয়ার কোন সম্ভাবনা দেখেন না বিশেষজ্ঞরা।
টাইম ম্যাগাজিনের মতে, ডেড সী স্ক্রোল ইতিহাসের অন্যতম সেরা অনুসন্ধান। রাজনৈতিক বিরোধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া খ্যাত ইসরাইলের অতিমাত্রায় গোপনীয়তার কারণে উন্মুক্ত বিশ্ব বঞ্চিত হচ্ছে অজানা সব রোমাঞ্চকর তথ্য থেকে।
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসরাইল অনুসন্ধানকারী দল ১২ নং গুহার সন্ধান পান বলে দাবি করেন। এর মাধ্যমে গবেষণায় এক নতুন সম্ভাবনার দেখা দেয়। কিন্তু এ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি কর্তৃপক্ষ
যতই দিন গড়াচ্ছে, ততই ঘনীভূত হয়ে পড়ছে রহস্য। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ বিচরণের যুগে ইসরাইলের এরূপ মনোভাব নিন্দাজনক। তবে আশা করা যায়, ভবিষ্যতে কোন তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপে হয়তো এই সমস্যার সমাধান হবে এবং বিশ্বদরবারে উন্মোচিত হবে স্ক্রোলের রহস্য।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স: ১. Dead Sea Scrolls: The Living Manuscripts of the Dead Sea – মূল গবেষণা প্রবন্ধ। ২. Israel Antiquities Authority (IAA) – ডিজিটাল লাইব্রেরি আর্কাইভ। ৩. Biblical Archaeological Society – বিশেষ প্রদর্শনী রিপোর্ট। ৪. ‘ইতিহাসের সন্ধানে’ (টক-শো) – মধ্যপ্রাচ্যের প্রত্নতাত্ত্বিক রাজনীতি বিষয়ক পর্ব।
সম্পাদনায়: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৭ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইতিহাস
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র (১৫শ খণ্ড), লে. কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ পিএসসির ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’, এবং সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাস ও সংবাদপত্র আর্কাইভস
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাস ছিল অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী, অস্থির এবং নাটকীয় পালাবদলের সময়। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে কয়েকটি সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে, যার চূড়ান্ত পরিণতি রূপ নেয় ৭ নভেম্বরের ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ বা ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি ও জনতার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধনে অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, যা বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক নতুন গতিপথে চালিত করে। এই ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল দিবসের নেপথ্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

১. পটভূমি: ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর খোন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ায় সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধে। এর জেরে ৩ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের তৎকালীন সিনিয়র অফিসার ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং ঢাকা ওয়ান বেঙ্গলের কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে একটি পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে।

খালেদ মোশাররফের এই অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তাঁর পদ থেকে পদচ্যুত করা হয় এবং ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে তাঁকে সম্পূর্ণ গৃহবন্দি (House Arrest) করে রাখা হয়। খন্দকার মোশতাককে সরিয়ে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ৬ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করেন।

২. নেপথ্যের অনুঘটক: জাসদ ও কর্নেল তাহেরের বিপ্লবের ডাক
মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের এই পাল্টা অভ্যুত্থানকে সেনাবাহিনীর সাধারণ জওয়ান বা সিপাহিদের একটি বড় অংশ ভারতের মদদপুষ্ট এবং মোশতাক চক্রের আরেকটি অংশের ক্ষমতার লড়াই হিসেবে চশমায় দেখছিল। এই সুযোগে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী দল ‘জাসদ’ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল)-এর সামরিক শাখা ‘গণবাহিনী’ এবং এর অন্যতম প্রধান নেতা লে. কর্নেল (অব.) আবু তাহের সেনানিবাসের সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে এক গোপন প্রচারণা চালান।
কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ সিপাহিদের বৈষম্য দূরীকরণ, ১২ দফা দাবি আদায় এবং ‘শ্রেণিহীন সামরিক ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ল্যান্স নায়েক ও সুবেদারদের সংগঠিত করে। ৭ নভেম্বর ভোররাতে এক গণ-অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল বন্দি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসা, কারণ জিয়াউর রহমান সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন।
৩. ৭ নভেম্বরের সেই ভয়াল রাত এবং সিপাহি-জনতার জাগরণ
৬ নভেম্বর মধ্যরাত পার হয়ে ৭ নভেম্বর ভোররাতে (আনুমানিক রাত ১টা থেকে ২টার মধ্যে) ঢাকা সেনানিবাসে সিপাহিদের বিদ্রোহ আনুষ্ঠানিকভাবে ফেটে পড়ে। ট্যাংকের গর্জন এবং শত শত রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণের মাধ্যমে সিপাহিরা ব্যারাকে ব্যারাকে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
- জিয়াউর রহমানের মুক্তি: সিপাহিদের একটি দল দ্রুত মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসভবনে যায় এবং পাহারারত সেন্ট্রিদের নিরস্ত্র করে তাঁকে অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত করে টু ফিল্ড আর্টিলারির সদর দপ্তরে নিয়ে আসে। মুক্ত হয়ে জিয়াউর রহমান সিপাহিদের শান্ত থাকার এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
- খালেদ মোশাররফের পতন ও মৃত্যু: সিপাহিদের এই ভয়াবহ বিদ্রোহের মুখে টিকতে না পেরে নবনিযুক্ত সেনাপ্রধান জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা এবং লে. কর্নেল এ টি এম হায়দার (যাঁরা সবাই বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন) শেরেবাংলা নগরের ১০ বেঙ্গলের সদর দপ্তরে আশ্রয় নেন। কিন্তু ৭ নভেম্বর সকালেই উত্তেজিত ও বিদ্রোহী সৈনিকদের হাতে এই তিন লিজেন্ডারি সামরিক কর্মকর্তা নির্মমভাবে নিহত হন।
- রাজপথে জনতার ঢল: সকাল হওয়ার সাথে সাথে সেনানিবাসের সিপাহিরা ট্রাকে করে, ট্যাংকের ওপর চড়ে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। তাদের মুখে স্লোগান ছিল—‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’, ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’। রাজপথের সাধারণ মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৈনিকদের সাথে যোগ দেয় এবং ফুলেল শুভেচ্ছা জানায়। সিপাহি ও জনতার এই অভূতপূর্ব সংহতির কারণেই দিনটিকে ইতিহাসে ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে অবিহিত করা হয়।
৪. রাজনৈতিক তাৎপর্য ও পরবর্তী ফলাফল
৭ নভেম্বরের এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দেয়:
- জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার কেন্দ্রে আগমন: এই বিপ্লবের পর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহাল থাকলেও, জিয়াউর রহমান উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (Chief Deputy Martial Law Administrator) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং কার্যত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।
- কর্নেল তাহেরের সাথে দূরত্ব: সিপাহিদের ১২ দফা দাবি এবং জাসদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী ধারার সাথে জিয়ার শাসনতান্ত্রিক ও শৃঙ্খলা রক্ষাকারী চিন্তাভাবনার দূরত্ব তৈরি হয়। যার ফলে পরবর্তীতে কর্নেল তাহেরসহ জাসদের অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সামরিক আদালতে কর্নেল তাহেরের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
ইতিহাসের পাতা সবসময় একমুখী নয়। ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেমন একটি পক্ষ ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ বা ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে অত্যন্ত গৌরব ও শ্রদ্ধার সাথে উদ্যাপন করে, ঠিক তেমনই আরেকটি পক্ষ এই দিনটিকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে স্মরণ করে, কারণ এই দিন সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বহু বীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও জওয়ানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। গুগলের ২০২৬ সালের নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক কনটেন্ট নির্দেশিকা অনুযায়ী, তরুণ প্রজন্মের জন্য কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত ছাড়া এই দিবসের সকল পক্ষের বাস্তব প্রেক্ষাপট ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সঠিকভাবে অনুধাবন করা জরুরি।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৬ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইসলাম ও জীবন
তথ্যসূত্র: আল-কোরআনের তাফসির (তাফসির ইবনে কাসির), সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিস এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত নবী-রাসূলদের জীবনী গ্রন্থ।
বর্তমান ২০২৬ সালের আধুনিক ও তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ যুগে মানুষ বাহ্যিক ও বস্তুগত দিক থেকে অনেক উন্নত হলেও, মানসিক প্রশান্তি, নৈতিকতা ও জীবনবোধের দিক থেকে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতি-ব্যবহার, পারস্পরিক দূরত্বের এই যুগে সঠিক জীবনদর্শনের অভাব স্পষ্ট। মানবজাতির হেদায়েত ও সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে যে নবী-রাসূলদের পাঠিয়েছেন, তাদের জীবন কেবল ইতিহাসের কিছু গল্প নয়; বরং তা কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য এক জীবন্ত ও কালজয়ী গাইডলাইন। এই বিশেষ সিরিজের ১ম পর্বে আমরা আলোচনা করব নবী-রাসূলদের অনন্য জীবন থেকে আজকের দিনে আমাদের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার মতো ৩টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
১. হযরত আইয়ুব (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা: চরম বিপদেও মানসিক শক্তি ও ধৈর্য (Patience)
আজকের যুগে সামান্য আর্থিক ক্ষতি, চাকরি হারানো কিংবা পারিবারিক বা শারীরিক অসুস্থতায় মানুষ দ্রুত হতাশ হয়ে পড়ে, এমনকি অনেকে আত্মহননের পথও বেছে নেয়। এই মানসিক সংকটে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় আদর্শ হলেন হযরত আইয়ুব (আ.)।
আল্লাহ তাআলা তাঁকে দীর্ঘ বছর ধরে কঠিন রোগ, সন্তানদের মৃত্যু এবং সমস্ত ধন-সম্পদ হারানোর মাধ্যমে পরীক্ষা করেছিলেন। কিন্তু এমন চরম সংকটেও তিনি আল্লাহর প্রতি বিন্দুমাত্র অভিযোগ করেননি, বরং চরম ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন।
- আজকের দিনের শিক্ষা: আধুনিক জীবনে বিষণ্ণতা (Depression) বা যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে ভেঙে না পড়ে ইতিবাচক থাকা এবং বিশ্বাস রাখা যে—কষ্টের পরেই স্বস্তি আসে। বিপদে অধৈর্য না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখাই হলো সফলতার মূল চাবি।
২. হযরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা: নৈতিক স্খলন ও প্রলোভন থেকে নিজেকে রক্ষা করা (Self-Control)
বর্তমান ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক মাধ্যমের উন্মুক্ততার কারণে তরুণ প্রজন্মের সামনে পর্নোগ্রাফি, অবৈধ সম্পর্ক এবং নৈতিক স্খলনের নানামুখী প্রলোভন প্রতিনিয়ত আসছে। নিজের চরিত্র ও নৈতিকতা ধরে রাখা আজকের দিনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
হযরত ইউসুফ (আ.) ছিলেন অপরূপ সুন্দর এবং যুবক। মিশরের আজিজের স্ত্রী যখন ঘরের সমস্ত দরজা বন্ধ করে উনাকে পাপের দিকে আহ্বান করেছিল, তখন তিনি সমস্ত প্রলোভন ও ক্ষমতার দাপটকে তুচ্ছ করে বলেছিলেন, “আমি আল্লাহর আশ্রয় চাচ্ছি।” পাপের চেয়ে তিনি কারাগারের বন্দিজীবনকে বেছে নিয়েছিলেন।

- আজকের দিনের শিক্ষা: চারপাশে যত বড় বা সহজ প্রলোভনই থাকুক না কেন, আল্লাহর ভয়কে অন্তরে জাগ্রত রেখে নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ (Self-Control) বজায় রাখা। ক্যারিয়ার বা জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে সাময়িক আনন্দের চেয়ে চিরস্থায়ী নৈতিকতা ও সততাকে প্রাধান্য দেওয়া।
৩. হযরত নূহ (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা: সামাজিক সমালোচনা উপেক্ষা করে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকা (Perseverance)
আজকের দিনে তরুণ বা উদ্যোক্তারা যখন নতুন বা ভালো কোনো কাজ করতে যায়, তখন সমাজের মানুষের সমালোচনা, ট্রল বা উপহাসের শিকার হয়ে অনেকেই মাঝপথে কাজ ছেড়ে দেয়। মানুষের কথা বা সামাজিক চাপের মুখে নিজের সৎ লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া খুবই সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হযরত নূহ (আ.) যখন আল্লাহর নির্দেশে মরুভূমির বুকে বিশাল নৌকা তৈরি করছিলেন, তখন সমকালীন সমাজের মানুষ উনাকে দেখে চরম উপহাস করত, পাগল বলত। কিন্তু তিনি মানুষের কোনো উপহাস বা ট্রলের দিকে কান না দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই নৌকাই বিশ্বাসীদের রক্ষা করেছিল।
- আজকের দিনের শিক্ষা: আপনি যদি নিশ্চিত হন যে আপনার কাজটি সৎ, সঠিক এবং মানবকল্যাণকর, তবে সমাজ বা সোশ্যাল মিডিয়ার মানুষ কী বলল বা কী ট্রল করল—তাতে কান না দিয়ে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকা। দৃঢ় সংকল্প এবং কঠোর পরিশ্রমই শেষ পর্যন্ত সত্যকে জয়ী করে।
নবী-রাসূলদের এই চমৎকার ঐতিহাসিক শিক্ষাগুলো কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং আমাদের প্রতিদিনের আচরণ, কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক জীবনে চর্চা করা উচিত। তবেই আমরা এই আধুনিক ও জটিল পৃথিবীতে একটি শান্তিপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গড়ে তুলতে সক্ষম হব।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৬ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইসলাম ও জীবন
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন, কালের কণ্ঠ ইসলামিক ডেস্ক, Salat Times (salat.habibur.com), এবং Muslim Bangla (muslimbangla.com)।
আজ শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ (২১শে কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৫শে জুমাদাল উলা ১৪৪৮ হিজরি)। ইসলামে প্রতিদিন সঠিক সময়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ফরজ। স্থানভেদে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে সময়ের কিছুটা তারতম্য বা পার্থক্য হয়ে থাকে। পাঠকদের সুবিধার্থে আজকের জুমার নামাজসহ ৫ ওয়াক্ত নামাজের সঠিক ও নিখুঁত সময়সূচি নিচে তুলে ধরা হলো।
১. ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি (Dhaka Division)
আজ ঢাকা ও এর আসেপাশের এলাকায় প্রতিটি ওয়াক্তের শুরুর সময় নিচে দেওয়া হলো:
- ফজর: ০৪:৫০ AM
- সূর্যোদয়: ০৬:০৮ AM
- জুহর (জুমা): ১১:৪৩ AM (আজ জুমার ওয়াক্ত শুরু দুপুর ১১:৪৩ মিনিটে)
- আসর: ০৩:৪০ PM
- মাগরিব (সূর্যাস্ত): ০৫:১৭ PM
- এশা: ০৬:৩৪ PM
২. অন্যান্য বিভাগীয় শহরের নামাজের সময় (যোগ-বিয়োগের নিয়ম)
ঢাকার সময়ের সাথে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অন্যান্য বিভাগের সময়ের কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ঢাকার সময়ের সাথে হিসাব করে আজকের বিভাগীয় শহরগুলোর নামাজের সময় নিচে দেওয়া হলো:

- চট্টগ্রাম বিভাগ: ঢাকার সময় থেকে প্রায় ৬ মিনিট আগে নামাজ শুরু হবে। (ফজর- ০৪:৪৪ AM, মাগরিব- ০৫:১১ PM)।
- সিলেট বিভাগ: ঢাকার সময় থেকে প্রায় ৬ মিনিট আগে নামাজ শুরু হবে। (ফজর- ০৪:৪৪ AM, মাগরিব- ০৫:১১ PM)।
- খুলনা বিভাগ: ঢাকার সময় থেকে প্রায় ২-৩ মিনিট পরে নামাজ শুরু হবে। (ফজর- ০৪:৫৩ AM, মাগরিব- ০৫:২০ PM)।
- রাজশাহী বিভাগ: ঢাকার সময় থেকে প্রায় ৬-৭ মিনিট পরে নামাজ শুরু হবে। (ফজর- ০৪:৫৭ AM, মাগরিব- ০৫:২৪ PM)।
- রংপুর বিভাগ: ঢাকার সময় থেকে প্রায় ৫-৬ মিনিট পরে নামাজ শুরু হবে।
- বরিশাল বিভাগ: ঢাকার সময়ের প্রায় কাছাকাছি সময়েই নামাজ অনুষ্ঠিত হবে।
৩. ময়মনসিংহ বিভাগের নামাজের সঠিক সময়সূচি (Mymensingh Division)
আজ ময়মনসিংহ ও এর আশেপাশের অঞ্চলের (যেমন- ধোবাউড়া) জন্য নামাজের সঠিক সময়সূচি নিচে আলাদাভাবে দেওয়া হলো:
- ফজর: ০৪:৫১ AM
- সূর্যোদয়: ০৬:০৮ AM
- জুহর (জুমা): ১১:৪৩ AM
- আসর: ০৩:৩৯ PM
- মাগরিব: ০৫:১৬ PM
- এশা: ০৬:৩৩ PM
৪. নামাজের নিষিদ্ধ সময়সমূহ
ইসলামিক নিয়ম অনুযায়ী সূর্য উদয়, অস্ত এবং ঠিক মধ্যগগনে থাকার সময় নামাজ আদায় করা নিষিদ্ধ। আজ ৬ নভেম্বরের নিষিদ্ধ সময়গুলো হলো:
- সকাল (সূর্যোদয়ের সময়): ০৬:০৮ AM থেকে পরবর্তী ১৫ মিনিট পর্যন্ত।
- দুপুর (ঠিক মাথার ওপর সূর্য): ১১:৩৮ AM থেকে ১১:৪২ AM পর্যন্ত।
- বিকেল (সূর্যাস্তের সময়): ০৫:০২ PM থেকে ০৫:১৭ PM পর্যন্ত (এই সময়ে মাগরিবের ফরজ নামাজ ব্যতীত অন্য কোনো নামাজ পড়া যাবে না)।
- আবহাওয়া ও ঋতু পরিবর্তনের কারণে প্রতিদিন নামাজের সময় ১-২ মিনিট পর্যন্ত পরিবর্তন হতে পারে। তাই আপনার স্থানীয় মসজিদের আজানের সময়কে অগ্রাধিকার দিন এবং জামায়াতের সাথে নামাজ আদায় করুন।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



