মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা

বাকশাল: বঙ্গবন্ধুর একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রয়াস
বাকশাল

নিউজ ডেস্ক

October 19, 2025

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
তারিখ: ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ প্রতিবেদন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে “বাকশাল” (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) এক গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত অধ্যায়।
অনেকে একে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেন, আবার কেউ কেউ বলেন এটি ছিল একটি অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের মডেল—যা সময়ের প্রেক্ষিতে সফল হওয়ার আগেই ইতিহাসে থেমে যায়।


🔹 বাকশাল কী?

বাকশাল হলো “বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ”-এর সংক্ষিপ্ত রূপ।
এটি ১৯৭৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে গঠিত হয়, যার মাধ্যমে দেশে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা চালু করা হয়।

বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দেন—

“বাংলাদেশে কৃষক, শ্রমিক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল শক্তি।”


🔹 পটভূমি: কেন বাকশাল?

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশ ছিল ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটে নিমজ্জিত—

  • ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও বন্যা,
  • সরকারি দুর্নীতি ও চোরাচালান,
  • বিরোধী দলের আন্দোলন ও সহিংসতা,
  • এবং দলীয় বিভক্তি ও নেতৃত্বের সংকট বঙ্গবন্ধুর প্রশাসনকে চাপে ফেলে দেয়।

এই পরিস্থিতিতে, বঙ্গবন্ধু মনে করেন—বিভক্ত রাজনীতি ও বহুদলীয় প্রতিযোগিতা নয়, বরং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্বই দেশ পুনর্গঠনের একমাত্র উপায়।


🔹 বাকশালের গঠন ও কাঠামো

১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত এই রাজনৈতিক কাঠামোর মূল দিকগুলো ছিল—

  1. বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ হবে দেশের একমাত্র বৈধ রাজনৈতিক দল।
  2. দেশের সব নাগরিক এই দলে যোগ দিতে পারবেন—শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক, আমলা, সেনা বা ছাত্র।
  3. দেশের প্রশাসন ও রাজনীতি চালাবে একটি কেন্দ্রীয় জাতীয় পরিষদ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হবে।
  4. সরকার-সমর্থিত চারটি পত্রিকা বাদে অন্যান্য সব সংবাদপত্র বন্ধ করা হয় (দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ অবজারভার, ইতিফাক, সংবাদ)।

🔹 বাকশালের উদ্দেশ্য

বঙ্গবন্ধুর ভাষায়,

“আমরা একটি শোষণমুক্ত সমাজ গড়তে চাই, যেখানে শ্রমিক ও কৃষক হবে রাষ্ট্রের মালিক।”

তবে রাজনৈতিকভাবে এই ব্যবস্থা ছিল বিরোধী মত দমন, প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের এক স্পষ্ট উদাহরণ।


🔹 সমালোচনা ও বিতর্ক

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দুইভাবে এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করেন:

সমর্থকদের মতে:

  • যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে দ্রুত পুনর্গঠনের প্রয়াস ছিল এটি।
  • বহুদলীয় বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ঐক্য আনাই ছিল লক্ষ্য।

সমালোচকদের মতে:

  • এটি ছিল একদলীয় স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা।
  • বিরোধী মত, সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা বিলোপ করে বাকশাল দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হয়ে যায়।

🔹 পরিণতি

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বাকশাল কার্যত বিলুপ্ত হয়।
নতুন সামরিক সরকার ক্ষমতায় এসে আবারও বহুদলীয় রাজনীতি চালু করে।


🔹 ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

বঙ্গবন্ধুর বাকশাল আজও ইতিহাসে তীব্র বিতর্কের বিষয়।
কেউ বলেন—

“এটি ছিল একটি সমাজতান্ত্রিক কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের শেষ চেষ্টা।”
আবার কেউ বলেন—
“এটি ছিল গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধের সূচনা।”

যাই হোক, বাকশাল বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে এক অনন্য ও জটিল অধ্যায়, যা স্বাধীনতার পর জাতি পুনর্গঠনের চেষ্টার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।


📚 সূত্র

  1. বঙ্গবন্ধুর ভাষণসমগ্র, খণ্ড–৫
  2. আবুল ফজল, বাংলাদেশের রাজনীতি: ১৯৭২–১৯৭৫
  3. আহমদ কবির, বঙ্গবন্ধু ও বাকশাল
  4. সরকারি গেজেট, ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৫

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস

নিউজ ডেস্ক

November 7, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৭ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইতিহাস
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র (১৫শ খণ্ড), লে. কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ পিএসসির ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’, এবং সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাস ও সংবাদপত্র আর্কাইভস 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাস ছিল অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী, অস্থির এবং নাটকীয় পালাবদলের সময়। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে কয়েকটি সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে, যার চূড়ান্ত পরিণতি রূপ নেয় ৭ নভেম্বরের ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ বা ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি ও জনতার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধনে অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, যা বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক নতুন গতিপথে চালিত করে। এই ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল দিবসের নেপথ্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো। 

১. পটভূমি: ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর খোন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ায় সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধে। এর জেরে ৩ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের তৎকালীন সিনিয়র অফিসার ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং ঢাকা ওয়ান বেঙ্গলের কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে একটি পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। 

খালেদ মোশাররফের এই অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তাঁর পদ থেকে পদচ্যুত করা হয় এবং ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে তাঁকে সম্পূর্ণ গৃহবন্দি (House Arrest) করে রাখা হয়। খন্দকার মোশতাককে সরিয়ে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ৬ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করেন। 

২. নেপথ্যের অনুঘটক: জাসদ ও কর্নেল তাহেরের বিপ্লবের ডাক
মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের এই পাল্টা অভ্যুত্থানকে সেনাবাহিনীর সাধারণ জওয়ান বা সিপাহিদের একটি বড় অংশ ভারতের মদদপুষ্ট এবং মোশতাক চক্রের আরেকটি অংশের ক্ষমতার লড়াই হিসেবে চশমায় দেখছিল। এই সুযোগে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী দল ‘জাসদ’ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল)-এর সামরিক শাখা ‘গণবাহিনী’ এবং এর অন্যতম প্রধান নেতা লে. কর্নেল (অব.) আবু তাহের সেনানিবাসের সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে এক গোপন প্রচারণা চালান। 

কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ সিপাহিদের বৈষম্য দূরীকরণ, ১২ দফা দাবি আদায় এবং ‘শ্রেণিহীন সামরিক ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ল্যান্স নায়েক ও সুবেদারদের সংগঠিত করে। ৭ নভেম্বর ভোররাতে এক গণ-অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল বন্দি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসা, কারণ জিয়াউর রহমান সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। 

৩. ৭ নভেম্বরের সেই ভয়াল রাত এবং সিপাহি-জনতার জাগরণ
৬ নভেম্বর মধ্যরাত পার হয়ে ৭ নভেম্বর ভোররাতে (আনুমানিক রাত ১টা থেকে ২টার মধ্যে) ঢাকা সেনানিবাসে সিপাহিদের বিদ্রোহ আনুষ্ঠানিকভাবে ফেটে পড়ে। ট্যাংকের গর্জন এবং শত শত রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণের মাধ্যমে সিপাহিরা ব্যারাকে ব্যারাকে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। 

  • জিয়াউর রহমানের মুক্তি: সিপাহিদের একটি দল দ্রুত মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসভবনে যায় এবং পাহারারত সেন্ট্রিদের নিরস্ত্র করে তাঁকে অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত করে টু ফিল্ড আর্টিলারির সদর দপ্তরে নিয়ে আসে। মুক্ত হয়ে জিয়াউর রহমান সিপাহিদের শান্ত থাকার এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান। 
  • খালেদ মোশাররফের পতন ও মৃত্যু: সিপাহিদের এই ভয়াবহ বিদ্রোহের মুখে টিকতে না পেরে নবনিযুক্ত সেনাপ্রধান জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা এবং লে. কর্নেল এ টি এম হায়দার (যাঁরা সবাই বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন) শেরেবাংলা নগরের ১০ বেঙ্গলের সদর দপ্তরে আশ্রয় নেন। কিন্তু ৭ নভেম্বর সকালেই উত্তেজিত ও বিদ্রোহী সৈনিকদের হাতে এই তিন লিজেন্ডারি সামরিক কর্মকর্তা নির্মমভাবে নিহত হন। 
  • রাজপথে জনতার ঢল: সকাল হওয়ার সাথে সাথে সেনানিবাসের সিপাহিরা ট্রাকে করে, ট্যাংকের ওপর চড়ে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। তাদের মুখে স্লোগান ছিল—‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’, ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’। রাজপথের সাধারণ মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৈনিকদের সাথে যোগ দেয় এবং ফুলেল শুভেচ্ছা জানায়। সিপাহি ও জনতার এই অভূতপূর্ব সংহতির কারণেই দিনটিকে ইতিহাসে ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে অবিহিত করা হয়। 

৪. রাজনৈতিক তাৎপর্য ও পরবর্তী ফলাফল
৭ নভেম্বরের এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দেয়: 

  • জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার কেন্দ্রে আগমন: এই বিপ্লবের পর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহাল থাকলেও, জিয়াউর রহমান উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (Chief Deputy Martial Law Administrator) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং কার্যত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। 
  • কর্নেল তাহেরের সাথে দূরত্ব: সিপাহিদের ১২ দফা দাবি এবং জাসদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী ধারার সাথে জিয়ার শাসনতান্ত্রিক ও শৃঙ্খলা রক্ষাকারী চিন্তাভাবনার দূরত্ব তৈরি হয়। যার ফলে পরবর্তীতে কর্নেল তাহেরসহ জাসদের অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সামরিক আদালতে কর্নেল তাহেরের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। 


ইতিহাসের পাতা সবসময় একমুখী নয়। ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেমন একটি পক্ষ ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ বা ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে অত্যন্ত গৌরব ও শ্রদ্ধার সাথে উদ্‌যাপন করে, ঠিক তেমনই আরেকটি পক্ষ এই দিনটিকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে স্মরণ করে, কারণ এই দিন সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বহু বীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও জওয়ানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। গুগলের ২০২৬ সালের নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক কনটেন্ট নির্দেশিকা অনুযায়ী, তরুণ প্রজন্মের জন্য কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত ছাড়া এই দিবসের সকল পক্ষের বাস্তব প্রেক্ষাপট ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সঠিকভাবে অনুধাবন করা জরুরি। 

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

জেল হত্যা দিবস

নিউজ ডেস্ক

November 4, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৩ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইতিহাস
তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট, বণিক বার্তা, প্রথম আলো, বিডিনিউজ২৪, বাংলা ট্রিবিউন ও যুগান্তরের প্রতিবেদন এবং আদালতের রায়-সংক্রান্ত সংবাদ প্রতিবেদন 

৩ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গভীর ক্ষত, অন্ধকারের दिन এবং দ্বিতীয় কলঙ্কময় অধ্যায়, যা ‘জেল হত্যা দিবস’ হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নিরাপদ প্রকোষ্ঠে বন্দি অবস্থায় স্বাধীন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। 

এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার চার জাতীয় নেতা হলেন: 

  • সৈয়দ নজরুল ইসলাম (মুজিবনগর সরকারের সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি) 
  • তাজউদ্দীন আহমদ (বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী) 
  • ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী (মুজিবনগর সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী ও পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী) 
  • এ এইচ এম কামারুজ্জামান (মুজিবনগর সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী) 

নেপথ্যের প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক ক্রান্তিকাল
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে একদল সেনা সদস্য। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। তৎকালীন এই খুনি সরকার আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে, যার ধারাবাহিকতায় এই শীর্ষ চার নেতাকেও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়। 

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে খন্দকার মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে একটি পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান (Counter-coup) শুরু হয়। খুনি চক্র বুঝতে পেরেছিল যে তাদের পতন আসন্ন। যদি আওয়ামী লীগের এই শীর্ষ চার নেতা জীবিত থাকেন, তবে তারা পুনরায় দেশের হাল ধরবেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ পরিচালিত হবে। তাই দেশকে সম্পূর্ণ নেতৃত্বহীন ও অভিভাবকহীন করার চূড়ান্ত নীল নকশা হিসেবে কারাগারে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। 

সেই ভয়াল রাতে কারাগারে যা ঘটেছিল
৩ নভেম্বর ভোররাত আনুমানিক ৪টার দিকে খাকি পোশাক পরিহিত এবং স্টেনগান ও এসএলআর (SLR)-এ সজ্জিত পাঁচজন সেনাসদস্য একটি পিকআপ ভ্যানে করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আসে। এদের নেতৃত্বে ছিলেন রিসালদার মোসলেম উদ্দিন। 

তৎকালীন উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজনস) কাজী আবদুল আউয়াল প্রথমে তাদের কারাগারে ঢুকতে বাধা দেন। তবে বঙ্গভবন থেকে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদের সরাসরি নির্দেশ পাওয়ার পর কারা কর্তৃপক্ষ খুনিদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়। এরপর জেলার আমিনুর রহমানকে নির্দেশ দেওয়া হয় আলাদা আলাদা সেলে থাকা চার নেতাকে ডেকে এনে একটি কক্ষে একত্রিত করার জন্য। চার নেতাকে একটি কক্ষে একত্র করার পর ঘাতকেরা তাদের ওপর ব্রাশফায়ার করে। গুলি করার পর মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাদের শরীর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয়। 

মামলার এজাহার (FIR) ও তদন্তের বিবরণ
হত্যাকাণ্ডের পরদিন, অর্থাৎ ৪ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে তৎকালীন ডিআইজি প্রিজনস কাজী আবদুল আউয়াল বাদী হয়ে লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। 

মামলার প্রথম তথ্য বিবরণী বা এজাহারে (FIR) উল্লেখ করা হয় যে, ৩ নভেম্বর ভোররাতে রাষ্ট্রপতির মৌখিক নির্দেশের কথা বলে কয়েকজন অবাধ্য সেনাসদস্য জোরপূর্বক কারাগারে প্রবেশ করে। তারা তৎকালীন জেনারেলে সেলে বন্দি জাতীয় চার নেতাকে এক কক্ষে জড়ো করে স্টেনগান ও রাইফেল দিয়ে ব্রাশফায়ার করে নির্মমভাবে হত্যা করে। 

মামলার পর তৎকালীন উপ-পুলিশ সুপার সাইফুদ্দিন আহমেদকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হলেও তাকে কারাগারে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে সামরিক সরকারগুলোর অনীহার কারণে দীর্ঘ ২১ বছর মামলার নথিপত্র, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং বিচার বিভাগীয় কমিশনের ফাইল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে গায়েব করে দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে আইনগত বাধা দূর হওয়ার পর সিআইডি (CID)-র তৎকালীন কর্মকর্তা আব্দুল কাহাত আকন্দ নতুনভাবে তদন্তভার গ্রহণ করেন এবং ১৯৯৮ সালে ২৩ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করেন। 

তৎকালীন আইনি নথি ও আদালতের চূড়ান্ত রায়
দীর্ঘ আইনি জটিলতা শেষে বিচারিক আদালত ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক সর্বমোট ১৫ জন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেওয়া হয়: 

  • মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি (৩ জন): সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকায় দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, দফাদার মারফত আলী শাহ এবং দফাদার আবুল হাসেম মৃধাকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। 
  • যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি (১২ জন): অপরাধের ষড়যন্ত্র ও সহযোগিতার জন্য (দণ্ডবিধির ৩০২/১০৯ ধারা) খন্দকার আব্দুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা, রাশেদ চৌধুরী, আহমেদ শরিফুল হোসেন, আব্দুল মাজেদ, মোহাম্মদ কিসমত হাশেম এবং নাজমুল হোসেন আনসারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। 

(উল্লেখ্য, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে ফারুক রহমান, শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা ও মহিউদ্দিন আহমেদকে অন্য একটি মামলা অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে)। 

২০০৮ সালের হাইকোর্টের বিতর্কিত রায় ও ২০১৩ সালের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন
২০০৪ সালের বিচারিক (নিম্ন) আদালত রায় দিলেও ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে (تৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে) হাইকোর্ট বিভাগ এই মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর একটি অত্যন্ত বিতর্কিত রায় প্রদান করেন। 

হাইকোর্টের তৎকালীন বেঞ্চ নিম্ন আদালতের রায় সংশোধন করে কেবল ১ জন আসামির (রিসালদার মোসলেম উদ্দিন) মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। অন্যদিকে, নিম্ন আদালত কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য ২ জন আসামি—দফাদার মারফত আলী শাহ এবং দফাদার আবুল হাসেম মৃধাকে সম্পূর্ণ খালাস দেওয়া হয়। সেই সাথে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ৪ জন আসামি—সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা এবং এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদকেও এই মামলা থেকে খালাস দেওয়া হয়। আদালতের যুক্তি ছিল, এই চারজনের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রে সরাসরি জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ প্রসিকিউশন উপস্থাপন করতে পারেনি। 

২০০৯ সালে এই বিতর্কিত রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি) দায়ের করা হয়। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ হাইকোর্টের ২০০৮ সালের রায়টিকে আইনি ভিত্তির অভাব ও ভুল পর্যালোচনার কারণে সম্পূর্ণ বাতিল (Dismiss) করে দেন। 

আপিল বিভাগ তাদের রায়ে উল্লেখ করেন যে, জাতীয় চার নেতাকে হত্যার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। এটি ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতা এবং একই খুনি চক্রের পূর্বপরিকল্পিত রাজনৈতিক নীল নকশা। তাই ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থেকে আসামিদের খালাস দেওয়া আইনগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ ছিল। আপিল বিভাগ ২০০৮ সালের হাইকোর্টের খালাসের সিদ্ধান্ত বাতিল করে ২০০৪ সালের নিম্ন আদালতের মূল রায়টিকেই হুবহু বহাল রাখেন। এর ফলে খালাস পাওয়া দফাদার মারফত আলী শাহ এবং দফাদার আবুল হাসেম মৃধার মৃত্যুদণ্ড পুনরায় পুনর্বহাল হয় এবং বাকিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকে। 

পলাতক আসামিদের বর্তমান অবস্থা ও প্রত্যর্পণের আইনি বাধা
আইনি নথির ১১ জন সাজাপ্রাপ্ত মূল আসামির মধ্যে ১০ জনই দীর্ঘ সময় ধরে পলাতক রয়েছেন এবং ১ জনের সাজা কার্যকর করা হয়েছে। এদের বর্তমান সর্বশেষ অবস্থা নিম্নরূপ: 

১. রিসালদার মোসলেম উদ্দিন (মৃত্যুদণ্ড): পলাতক; ভারতে আত্মগোপনে থাকার গুঞ্জন থাকলেও সুনির্দিষ্ট অবস্থান এখনও অজানা।
২. দফাদার মারফত আলী শাহ (মৃত্যুদণ্ড): পলাতক; তার বর্তমান অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি।
3. দফাদার আবুল হাসেম মৃধা (মৃত্যুদণ্ড): পলাতক; নিখোঁজ ও অবস্থান অজানা।
৪. লে. কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আব্দুর রশিদ (যাবজ্জীবন): পলাতক; লিবিয়া ও পাকিস্তানে বিভিন্ন সময়ে অবস্থান করার তথ্য রয়েছে।
৫. লে. কর্নেল (অব্যাহতি) শরিফুল হক ডালিম (যাবজ্জীবন): পলাতক; পাকিস্তান ও যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হয়।
৬. লে. কর্নেল এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী (যাবজ্জীবন): পলাতক;加拿大য় রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন।
৭. লে. কর্নেল রাশেদ চৌধুরী (যাবজ্জীবন): পলাতক; যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন।
৮. ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসার (যাবজ্জীবন): পলাতক; কানাডায় অবস্থান করছেন।
৯. মেজর (অব.) আহমেদ শরিফুল হোসেন (যাবজ্জীবন): পলাতক; অবস্থান অজ্ঞাত।
১০. াক্যাপ্টেন (অব.) মোহাম্মদ কিসমত হাশেম (যাবজ্জীবন): পলাতক থাকা অবস্থায় কানাডায় মৃত্যুবরণ করেছেন।
১১. ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আব্দুল মাজেদ (যাবজ্জীবন): সাজা কার্যকর। দীর্ঘদিন ভারতে পলাতক থাকার পর ২০২০ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২০২০ সালের ১২ এপ্রিল তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। 

কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসামিদের ফিরিয়ে আনার আইনি বাধা:
লে. কর্নেল এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী কানাডায় এবং লে. কর্নেল রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক থাকলেও দেশ দুটির অভ্যন্তরীণ আইনি জটিলতার কারণে তাদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। 

কানাডার ‘Extradition Act’ (কানাডিয়ান প্রত্যর্পণ আইন) এবং ‘কানাডিয়ান চার্টার অব রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমস’-এর ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী—কানাডা সরকার এমন কোনো দেশে কোনো ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ বা ফেরত পাঠাতে পারে না যেখানে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। যেহেতু নূর চৌধুরী বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, তাই কানাডা তাকে ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। 

অন্যদিকে, রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় (Asylum) নিয়ে অবস্থান করছেন। আমেরিকার আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে নিজ দেশে ফেরত গেলে তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা অবিচারের শিকার হতে পারেন, তবে তাকে সুরক্ষামূলক আশ্রয় দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরত চাওয়ার পর মার্কিন বিচার বিভাগ (DOJ) তার রাজনৈতিক আশ্রয়ের ফাইলটি নতুন করে পর্যালোচনার উদ্যোগ নিলেও, সে দেশের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং আদালতের আপিল ব্যবস্থার কারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও ঝুলে রয়েছে। এছাড়া, বাংলাদেশের সাথে কানাডা বা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো দ্বিপাক্ষিক ও কার্যকর প্রত্যর্পণ চুক্তি (Extradition Treaty) না থাকাও একটি বড় আইনি প্রতিবন্ধকতা। 

জাতীয় চার নেতার রাজনৈতিক সততা, সাহস এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অবিচল আনুগত্য চিরকাল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য প্রেরণা হয়ে থাকবে। 

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মুক্তিযুদ্ধ

নিউজ ডেস্ক

September 29, 2026

শেয়ার করুন

লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
বিভাগ (Category): ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ
প্রকাশের তারিখ: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
তথ্যসূত্র (Sources): বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ), প্রথম আলোর ১৯৭১ আর্কাইভ প্রকল্প, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাঠ্যক্রম-সহায়ক উপকরণ


ঢাকা: “ভারত সাহায্য না করলে কি বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না?” — এই প্রশ্নটি প্রতি বছর বিজয় দিবস এলেই নতুন করে আলোচনায় আসে। প্রশ্নটির সহজ উত্তর নেই, কারণ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল দুটি সমান্তরাল বাস্তবতার সমন্বয় — একদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুক্তিবাহিনীর নয় মাসের রক্তক্ষয়ী গেরিলা লড়াই, অন্যদিকে ভারতের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ ও শেষ পর্যায়ে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ।

মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের শুরু

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর “অপারেশন সার্চলাইট” শুরু হওয়ার পরপরই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ও পুলিশের বাঙালি সদস্যরা বিদ্রোহ করেন এবং সাধারণ মানুষ তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মুক্তিবাহিনী গঠন করেন। এপ্রিলের শুরুতে হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়ায় মুক্তিবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সংগঠিত হন এবং কর্নেল এম এ জি ওসমানীর নেতৃত্বে যুদ্ধ পরিচালনার কাঠামো দাঁড় করানো হয়।

ভারতের প্রাথমিক ভূমিকা: প্রশিক্ষণ, আশ্রয় ও কূটনীতি

যুদ্ধের শুরু থেকেই প্রায় এক কোটি বাঙালি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেন, যা ভারতের জন্য বিশাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে। ভারতীয় সেনাবাহিনী মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের সীমান্তবর্তী এলাকায় স্বল্পমেয়াদী (দুই থেকে পাঁচ সপ্তাহের) প্রশিক্ষণ ও হালকা অস্ত্র সরবরাহে সহায়তা করে। তবে এই পর্যায়ে ভারী অস্ত্র বা সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা ছিল সীমিত। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল থেকেই বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ভারতের কাছে অধিক সামরিক সহায়তার দাবি জানালেও ভারত সরকার তখনই পূর্ণ মাত্রায় সাড়া দেয়নি — মুক্তিবাহিনীর গেরিলা যুদ্ধে ধারাবাহিক সাফল্যই পরবর্তীতে ভারতকে সহায়তা বাড়াতে উদ্বুদ্ধ করে।

মুক্তিবাহিনীর স্বাধীন লড়াই

নয় মাস ধরে মুক্তিবাহিনী দুই ধারায় যুদ্ধ চালিয়ে যায়। একটি অংশ সীমান্ত পার হয়ে আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে আবার ফিরে যেত, আরেকটি অংশ দেশের অভ্যন্তরে থেকেই অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালাত। নৌ কমান্ডোদের পরিচালিত “অপারেশন জ্যাকপট” পাকিস্তানি নৌবাহিনীর জাহাজ ধ্বংস করে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে বড় ধাক্কা দেয়। এ সময় বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর প্রাথমিক কাঠামোও গড়ে ওঠে। এই লড়াই এতটাই কার্যকর ছিল যে পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল ব্যাপকভাবে ভেঙে পড়ে, যদিও পেশাদার ও ভারী অস্ত্রসজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীকে স্বল্প সময়ে সম্পূর্ণ পরাস্ত করা মুক্তিবাহিনীর একার পক্ষে কঠিন ছিল বলে সামরিক ইতিহাসবিদরা মনে করেন।

নভেম্বর-ডিসেম্বর: যৌথ কমান্ড ও সরাসরি হস্তক্ষেপ

১৯৭১ সালের নভেম্বরে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর মধ্যে যৌথ কমান্ড গঠিত হয়। নভেম্বরের শেষদিকে যশোর সেক্টরে গরিবপুরের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সীমান্তে সংঘর্ষ তীব্র হতে থাকে, আর ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতের পশ্চিম সীমান্তে বিমান হামলা চালালে যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। এরপর ভারতীয় সেনাবাহিনীর একাধিক কোর, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করে এবং মুক্তিবাহিনীর সহযোগিতায় দ্রুত ঢাকার দিকে অগ্রসর হয়। মাত্র ১৩ দিনের এই সম্মিলিত অভিযানের পর ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার নেতৃত্বাধীন যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে।

ইতিহাস চর্চায় দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গি

মুক্তিযুদ্ধের এই ইতিহাস নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের জনআলোচনায় মাঝেমধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য দেখা যায়। বাংলাদেশে স্বাভাবিকভাবেই মুক্তিযুদ্ধকে মূলত নিজস্ব জনগণের ত্যাগ, সংগ্রাম ও অসংখ্য শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা হিসেবে স্মরণ করা হয় — আর ভারতের সহায়তাকে এই লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণীয় অবদান হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে ভারতীয় কিছু লেখক ও সামরিক বিশ্লেষক মনে করেন, ভারতীয় বাহিনীর সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া অত দ্রুত সময়ে (মাত্র ১৩ দিনে) সিদ্ধান্তমূলক বিজয় অর্জন সম্ভব হতো না, আর এই অবদান কখনো কখনো যথেষ্ট আলোচিত হয় না বলে তাঁরা মনে করেন। উভয় দৃষ্টিভঙ্গিই ঐতিহাসিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, তবে জোর দেওয়ার জায়গা আলাদা — এটি একটি চলমান ঐতিহাসিক আলোচনার বিষয়, যেখানে একটি সরলীকৃত উত্তরে পৌঁছানো কঠিন।

উপসংহার

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কোনো একক বাহিনী বা দেশের একক কৃতিত্বের গল্প নয়। মুক্তিবাহিনীর নয় মাসের আত্মত্যাগ, দেশপ্রেম ও গেরিলা লড়াই যেমন যুদ্ধের ভিত্তি তৈরি করেছিল, তেমনি ভারতের প্রশিক্ষণ, আশ্রয়দান, কূটনৈতিক সমর্থন ও শেষ পর্যায়ের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ যুদ্ধকে দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সহায়তা করেছিল। এই দুই বাস্তবতাকে পাশাপাশি রেখেই ১৯৭১ সালের ইতিহাসকে সবচেয়ে সঠিকভাবে বোঝা সম্ভব।


আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

২৩শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ