আন্তর্জাতিক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
In a highly anticipated political development, Bangladesh’s next national election is set to be held in February 2025—before the holy month of Ramadan. This decision was reached in a strategic one-on-one meeting between Dr. Muhammad Yunus, the interim head of the caretaker government, and BNP Acting Chairman Tarique Rahman, held in London.
Meeting Time: 2:00 PM Bangladesh Time
Venue: The Dorchester Hotel, Park Lane, Central London
Meeting Ended: Around 3:45 PM (Bangladesh Time)
Sources from a leading Bangladeshi media outlet confirmed the agreement, adding weight to the momentum building around electoral clarity and national stability.
Tarique Rahman was seen exiting the venue with a smiling face, signaling a positive outcome from the dialogue.
According to insiders, the two leaders discussed election timelines, caretaker responsibilities, and proposed reforms for the Election Commission. The meeting aimed at shaping a roadmap for peaceful transition and fair elections in Bangladesh.
Reporter: BDS Bulbul Ahmed
For more news, visit: Pulse Bangladesh
বিষয়ঃ
আন্তর্জাতিক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদনের শিরোনাম: চীন দেশের ১০টি অবাক করা ও বিস্ময়কর তথ্য
প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
বিভাগ (Category): বিশ্ব সংস্কৃতি, সাধারণ জ্ঞান ও বৈচিত্র্য
প্রকাশের তারিখ: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
তথ্যসূত্র (Sources): ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO), বিশ্বসংস্কৃতি রেকর্ড ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম।
পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও বৈচিত্র্যময় দেশ চীন। ইতিহাস, ভৌগোলিক ক্ষেত্র ও জনসংখ্যা—সব দিক দিয়েই চীনের অবস্থান বিশ্বমঞ্চে অনন্য। প্রাচ্যের এই বিশাল দেশে এমন বহু ঐতিহ্য ও সামাজিক চর্চা রয়েছে যা বাইরের দেশের মানুষের কাছে যেমন বিস্ময়কর, তেমনই বেশ কৌতুহল উদ্দীপক।

চীন দেশ সম্পর্কে ১০টি অবাক করা ও বিস্ময়কর তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
- এক টাইম জোন: বিশাল আয়তনের দেশ হওয়া সত্ত্বেও পুরো চীনে মাত্র একটি টাইম জোন (Beijing Time) চালু রয়েছে। এর ফলে দেশের পশ্চিম প্রান্তে সকালের সূর্য উঠতে অনেক সময় সকাল ১০টা বেজে যায়।
- বর্ণমালা ছাড়াই ভাষা: চীনা ভাষার কোনো বর্ণমালা বা অ্যালফাবেট নেই। এর বদলে হাজার হাজার পিকটোগ্রাফিক ক্যারেক্টার বা চিত্রভিত্তিক বর্ণ ব্যবহার করা হয়। স্বাভাবিক কাজের জন্য প্রায় ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ ক্যারেক্টার জানতে হয়।
- গুহায় বসবাস: আধুনিক যুগেও চীনের লক্ষ লক্ষ মানুষ (প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখের বেশি) ঐতিহ্যগতভাবে পাহাড়ি অঞ্চলের গুহায় বা মাটির নিচে তৈরি বিশেষ ধরনের বাড়িতে বসবাস করেন।
- বিশ্বের দীর্ঘতম রেল নেটওয়ার্ক: চীনের হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্ক এতটাই বিশাল যে এর রেলপথ দিয়ে পৃথিবীকে প্রায় চারবার পেঁচিয়ে ফেলা সম্ভব।
- প্রাচীরের দৈর্ঘ্য: বিখ্যাত গ্রেট ওয়াল অব চায়না-এর মূল দৈর্ঘ্য প্রায় ২১,১৯৬ কিলোমিটার, যা মানবসৃষ্ট প্রাচীন স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।
- বর্ষার রঙ সাদা: পশ্চিমা সংস্কৃতির মতো চীনে কালো নয়, বরং সাদা রঙকে শোক, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও দুঃখের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।
- টয়লেট পেপারের প্রচলন: ত্রয়োদশ শতাব্দীতে চীনে প্রথম টয়লেট পেপারের ব্যবহার শুরু হয়, যা সে সময় শুধুমাত্র রাজপরিবারের সম্রাট ও তাদের সদস্যদের ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট ছিল।
- পাহারায় রাজহাঁস: চীনের অনেক পুলিশ স্টেশন ও খামারে কুকুরের পাশাপাশি বা বিকল্প হিসেবে পাহারাদার হিসেবে রাজহাঁস ব্যবহার করা হয়। হাঁসের দৃষ্টিশক্তি ও তীক্ষ্ণ শব্দ করার ক্ষমতা বেশ কার্যকর।
- চপস্টিকের ব্যবহার: চীনে প্রতি বছর প্রায় ৪৫ বিলিয়ন বা সাড়ে চার হাজার কোটি চপস্টিক ব্যবহার করা হয়, যার বেশিরভাগই কাঠের তৈরি।
- প্রাচীন আবিষ্কার: বর্তমান বিশ্বের জনপ্রিয় খেলা ফুটবল, ঘুড়ি ও কম্পাসের আদি রূপ প্রাচীন চীনেই প্রথম উদ্ভাবিত হয়েছিল।
প্রাচীন ইতিহাস ও রাজবংশ সম্পর্কে আর অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত আধুনিক অগ্রগতি নিয়ে আমাকে বিস্তারিত
চীনের প্রাচীন ইতিহাস ও রাজবংশ এবং আধুনিক যুগে এসে তাদের যে অভাবনীয় অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত রূপান্তর ঘটেছে, তা মানব ইতিহাসের অন্যতম এক বিস্ময়। নিচে দুটি বিষয়ই বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

প্রাচীন ইতিহাস ও রাজবংশ (Ancient History & Dynasties)
চীনের সভ্যতাকে পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী এবং ধারাবাহিক সভ্যতা বলা হয়। প্রায় ৫,০০০ বছর আগে হলুদ নদী (Yellow River) বা হুয়াং হো নদীর অববাহিকায় এই সভ্যতার সূচনা ঘটেছিল। চীনের ইতিহাস মূলত বিভিন্ন শক্তিশালী রাজবংশের উত্থান ও পতনের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়েছে:
- শিয়া ও শাং রাজবংশ (Xia & Shang Dynasty): শিয়া রাজবংশকে চীনের প্রথম কিংবদন্তি রাজবংশ ধরা হলেও, শাং রাজবংশ (১৬০০–১০৪৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) থেকে চীনের লিখিত ইতিহাসের অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়। এই যুগেই প্রথম চিনা লিপির আদি রূপ আবিষ্কৃত হয়।
- ঝৌ রাজবংশ (Zhou Dynasty): এটি চীনের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় (প্রায় ৮০০ বছর) শাসন করা রাজবংশ। এই যুগেই চীনের বিখ্যাত দুই দার্শনিক কনফুসিয়াস এবং লাও জে (তাওবাদের প্রতিষ্ঠাতা) তাদের দর্শন প্রচার করেন, যা চিনা সমাজকে চিরতরে বদলে দেয়।
- কিন রাজবংশ (Qin Dynasty): মাত্র ১৫ বছর টিকলেও এই রাজবংশের রাজা কিন শি হুয়াং ২২১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে টুকরো টুকরো চীনকে একত্রিত করে প্রথম চিনা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নাম থেকেই ‘চায়না’ বা ‘চীন’ নামের উৎপত্তি। তিনি মুদ্রা, ওজন ও পরিমাপের একক এক করেন এবং বহিরাগত আক্রমণ ঠেকাতে গ্রেট ওয়াল বা চীনের প্রাচীর নির্মাণ শুরু করেন।
- হান রাজবংশ (Han Dynasty): (২০৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ – ২২০ খ্রিষ্টাব্দ) একে চীনের ইতিহাসের ‘স্বর্ণযুগ’ বলা হয়। এই সময়েই এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যের মূল পথ সিল্ক রোড (Silk Road) প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া কাগজ আবিষ্কার এবং সরকারি চাকরিতে পরীক্ষা পদ্ধতির সূচনা এই বংশেরই অবদান।
- ট্যাং ও সং রাজবংশ (Tang & Song Dynasty): ট্যাং আমলে কবিতা ও শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটে এবং সং আমলে বারুদ, কম্পাস ও কাঠের ব্লকে মুদ্রণ পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়, যা বিশ্বের ইতিহাসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।
- মিং ও কিং রাজবংশ (Ming & Qing Dynasty): মিং রাজবংশ (১৩৬৮–১৬৪৪) চীনের প্রাচীরের আধুনিক সংস্করণ এবং বেইজিংয়ের বিখ্যাত ‘ফরবিডেন সিটি’ তৈরি করে। আর কিং রাজবংশ (১৬ party–১৯১২) ছিল চীনের শেষ রাজবংশ, যার পতনের মধ্য দিয়ে চীনে ২,০০০ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং ১৯১২ সালে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
আধুনিক অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি
১৯৪৯ সালে মাও সেতুং-এর নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন (PRC) গঠিত হওয়ার পর দেশটি সমাজতান্ত্রিক ধারায় চলতে থাকে। তবে ১৯৭৮ সালে লিডার দং শিয়াওপিং-এর “সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ” (Reform and Opening-up) নীতির পর চীনের অর্থনীতিতে এক অলৌকিক পরিবর্তন আসে। [
অর্থনৈতিক রূপান্তর:
- বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি: গত চার দশকে চীন প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্যসীমা থেকে বের করে এনেছে, যা বিশ্ব ইতিহাসে এক রেকর্ড। বর্তমানে জিডিপির (GDP) দিক থেকে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র।
- বিশ্বের কারখানা (The World’s Factory): সস্তা শ্রম, উন্নত অবকাঠামো এবং বিশাল উৎপাদন ক্ষমতার কারণে পৃথিবীর সিংহভাগ ইলেকট্রনিক্স, পোশাক ও ভারী যন্ত্রপাতি চীনেই তৈরি হয়।
- বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI): প্রাচীন সিল্ক রোডের আদলে চীন বিশ্বের শতাধিক দেশের সাথে সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথের এক বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের প্রভাব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে。
প্রযুক্তিগত আধিপত্য:
বর্তমান যুগে চীন কেবল পণ্য নকল বা সস্তা উৎপাদনের দেশ নয়, বরং তারা বৈশ্বিক প্রযুক্তির নেতৃত্ব দিচ্ছে:
- টেলিকমিউনিকেশন ও ৫জি (5G): অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউট (ASPI)-এর গবেষণা অনুযায়ী, ৪৪টি জটিল ও উদীয়মান প্রযুক্তির মধ্যে ৩৭টিতেই চীন বিশ্বে সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ৫জি ইন্টারনেট অবকাঠামোতে তারা একক আধিপত্য বজায় রেখেছে।
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতি (AI & Digital Economy): ফেসিয়াল রিকগনিশন, এআই (AI) চালিত অ্যালগরিদম এবং বিগ ডেটা ব্যবহারে চীন অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে। হুয়াওয়ে (Huawei), আলিবাবা (Alibaba) এবং টেনসেন্ট (Tencent)-এর মতো টেক জায়ান্টরা এখন সিলিকন ভ্যালির কোম্পানিগুলোকে টক্কর দিচ্ছে।
- গ্রিন এনার্জি ও ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV): জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে চীন বিশ্বের বৃহত্তম সৌর প্যানেল, উইন্ড মিল এবং ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারি উৎপাদনকারী দেশ। বিওয়াইডি (BYD) এর মতো চিনা কোম্পানি এখন বিশ্ব বাজারে টেসলার অন্যতম বড় প্রতিযোগী।
- মহাকাশ ও মেগা-ইঞ্জিনিয়ারিং: চীন নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন ‘তিয়ানগং’ (Tiangong) তৈরি করেছে এবং চাঁদের দুর্গম দূরবর্তী অংশে (Far Side of the Moon) রোভার পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সেতু, বুলেট ট্রেন নেটওয়ার্ক এবং বিশাল সব ড্যাম (যেমন- থ্রি গর্জেস ড্যাম) তাদের মেগা-ইঞ্জিনিয়ারিং ক্ষমতার প্রমাণ。
বিখ্যাত কনফুসীয় দর্শন বা চীনের প্রাচীর নির্মাণের পেছনের গল্প

কনফুসীয় দর্শন এবং চীনের প্রাচীর—এই দুটিই চীনের হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির মূল স্তম্ভ। এর একটি মানুষের মন ও সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, আর অন্যটি বাইরের শত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করেছে। নিচে এই দুটির পেছনের গল্প বিস্তারিত দেওয়া হলো:
বিখ্যাত কনফুসীয় দর্শনের গল্প (The Story of Confucianism)
খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে (৫৫১–৪৭৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) চীনে যখন ঝৌ রাজবংশ শাসন করছিল, তখন চিনা সমাজ মারাত্মক বিশৃঙ্খলা, যুদ্ধ এবং নৈতিক অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। সেই অশান্ত সময়ে আবির্ভূত হন চিনের সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিক ও শিক্ষক কনফুসিয়াস (চিনা নাম: কোং কিউ)।
দর্শনের পেছনের মূল উদ্দেশ্য:
কনফুসিয়াস কোনো নতুন ধর্ম প্রচার করেননি। তিনি চেয়েছিলেন সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা এবং নৈতিকতা ফিরিয়ে আনতে। তাঁর মতে, সমাজকে যদি সুন্দর করতে হয়, তবে মানুষকে ভেতর থেকে সৎ ও দায়িত্বশীল হতে হবে।
কনফুসীয় দর্শনের মূল ভিত্তি বা স্তম্ভগুলো:
- রেন (Ren – মানবতা ও পরোপকার): মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, দয়া এবং সহমর্মিতা থাকতে হবে। এটিই চিনা সংস্কৃতির মূল ভিত্তি।
- শাও (Xiao – সন্তানসুলভ ভক্তি): পরিবারের বড়দের, বিশেষ করে বাবা-মার প্রতি সন্তানদের পরম শ্রদ্ধা ও বাধ্য থাকা। কনফুসিয়াস মনে করতেন, পরিবারে যদি শৃঙ্খলা থাকে, তবে রাষ্ট্রেও শান্তি বজায় থাকবে。
- লি (Li – আচার-অনুষ্ঠান ও সদাচরণ): সমাজে বা রাষ্ট্রে কার কী ভূমিকা (যেমন: শাসকের প্রতি প্রজার, শিক্ষকের প্রতি ছাত্রের দায়িত্ব) তা যথাযথভাবে পালন করা এবং ভদ্রতা বজায় রাখা।
- সৎ শাসক: কনফুসিয়াস বিশ্বাস করতেন, একজন রাজাকে অবশ্যই নৈতিকভাবে নিখুঁত হতে হবে। রাজা যদি প্রজাদের প্রতি দয়ালু ও ন্যায়পরায়ণ হন, তবে প্রজারাও রাজাকে শ্রদ্ধা করবে এবং রাজ্যে কোনো বিদ্রোহ হবে না।
ঐতিহাসিক মোড়: প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াং এই দর্শনকে নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং কনফুসীয় বই পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী হান রাজবংশের আমলে একে চীনের রাষ্ট্রীয় দর্শন হিসেবে গ্রহণ করা হয়। প্রায় দুই হাজার বছর ধরে চীনের রাজকীয় আমলাতন্ত্র ও সরকারি চাকুরির পরীক্ষা এই কনফুসীয় দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হতো।
চীনের প্রাচীর নির্মাণের পেছনের গল্প (The Story of the Great Wall)
অনেকেই মনে করেন চীনের প্রাচীর একবারে বা একটি নির্দিষ্ট রাজবংশের আমলে তৈরি হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ভুল। এটি মূলত ২,০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন রাজবংশের টুকরো টুকরো কাজের এক বিশাল সমষ্টি।
নির্মাণের পেছনের আসল কারণ:
চীনের উত্তর সীমান্তে ছিল মঙ্গোলিয়া ও মাঞ্চুরিয়ার বিশাল বিস্তীর্ণ তৃণভূমি (Steppes)। সেখানে বসবাস করত যাযাবর ও দুর্ধর্ষ যুদ্ধবাজ উপজাতিরা (যেমন: শিয়ংনু, মঙ্গোল)। কৃষিপ্রধান এবং উন্নত চিনা সাম্রাজ্যগুলোতে এই যাযাবর ঘোড়সওয়াররা প্রায়ই আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে ধন-সম্পদ, ফসল ও গবাদিপশু লুট করে নিয়ে যেত। এই যাযাবর দস্যুদের হাত থেকে চিনা সীমান্ত ও প্রাচীন বাণিজ্যের মূল পথ সিল্ক রোড রক্ষা করাই ছিল প্রাচীর নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য।
যেভাবে শুরু ও শেষ হয়েছিল:
- টুকরো দেয়াল (৭ম খ্রিষ্টপূর্বাব্দ): প্রাচীন চীনের ছোট ছোট রাজ্যগুলো নিজেদের সুরক্ষার জন্য নিজ নিজ সীমান্তে ছোট ছোট মাটির দেয়াল তৈরি করেছিল।
- একত্রীকরণ (২২১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ): চীনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াং পুরো চীনকে একত্রিত করার পর ভেতরের রাজ্যগুলোর দেয়াল ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন। তিনি উত্তরের যাযাবরদের ঠেকাতে পূর্বের তৈরি টুকরো দেয়ালগুলোকে একসাথে জুড়ে দিয়ে একটি বিশাল প্রতিরক্ষাব্যূহ তৈরির কাজ শুরু করেন। এটিই ছিল গ্রেট ওয়ালের প্রথম আদি রূপ।
- আধুনিক রূপ (১৩৬৮–১৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দ): আজ আমরা পর্যটক হিসেবে পাথরের তৈরি যে সুন্দর ও মজবুত প্রাচীর দেখতে পাই, তা মূলত মিং রাজবংশের আমলে তৈরি। মঙ্গোল নেতা চেঙ্গিস খানের বংশধরদের আক্রমণ ঠেকাতে তারা ইট ও পাথর দিয়ে ওয়াচটাওয়ারসহ এই আধুনিক প্রাচীর নির্মাণ করে।
“বিশ্বের দীর্ঘতম কবরস্থান” এর ট্র্যাজেডি:
প্রাচীর নির্মাণের পেছনের গল্পটি যেমন বীরত্বের, তেমনই চরম নিষ্ঠুরতার। সম্রাট কিন শি হুয়াং এই প্রাচীর তৈরির জন্য দেশের লাখ লাখ সাধারণ কৃষক, অপরাধী এবং বন্দি সেনাদের জোরপূর্বক উত্তর সীমান্তে পাঠাতেন।
পাহাড়ি দুর্গম অঞ্চল, হাড়কাঁপানো শীত, খাদ্যাভাব এবং প্রচণ্ড শারীরিক খাটাখাটুনির কারণে প্রাচীর নির্মাণ করতে গিয়ে প্রায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ মারা যায়। লোককথা অনুযায়ী, যেসব শ্রমিক কাজ করতে করতে মারা যেতেন, তাদের মৃতদেহ অন্য কোথাও না নিয়ে প্রাচীরের ভেতরেই মাটি চাপা দেওয়া হতো। এই চরম মানবিক ট্র্যাজেডির কারণে চীনের প্রাচীরকে অনানুষ্ঠানিকভাবে “বিশ্বের দীর্ঘতম কবরস্থান” (The World’s Longest Cemetery) বলা হয়ে থাকে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): ইতিহাস, রাজনীতি ও বায়োগ্রাফি
- প্রকাশের তারিখ: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): প্রখ্যাত রাজনৈতিক ইতিহাস নথিপত্র, আর্কাইভাল রেকর্ড ও পারিবারিক ইতিহাস গাইড।
একটি পরিবারের বা ব্যক্তির পৈতৃক শিকড়, জন্মস্থান, কর্মস্থল, স্থায়ী বসবাস এবং মৃত্যুর পর সমাহিত হওয়ার স্থান—এই বিষয়গুলো ইতিহাস ও জীবনযাত্রার ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায় নির্দেশ করে। চাকরি, ব্যবসা, রাজনীতি কিংবা দেশভাগের মতো ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে মানুষের জীবনধারা স্থানান্তরিত হওয়া ইতিহাসজুড়ে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিএনপি নেতা তারেক রহমানের পারিবারিক ইতিহাস এবং তাঁর দাদা-দাদির করাচিতে সমাহিত হওয়ার মূল কারণও এই ঐতিহাসিক ও পেশাগত পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত।
১. পৈতৃক শিকড় ও পরিবারের ধারাবাহিকতা

বীর উত্তম শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পৈতৃক পরিবার মূলত বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী এলাকার বাসিন্দা।
- পৈতৃক মূল রূপরেখা: জিয়াউর রহমানের নিজের দাদা মৌলভী কামালউদ্দিন মণ্ডল বগুড়ার মহিষাবান এলাকা থেকে বাগবাড়ীতে আগমন করেন এবং মেহেরুন্নিসাকে বিয়ে করেন। তিনি বাগবাড়ী মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
- জিয়াউর রহমানের জন্ম: ১৯৩৬ সালে জিয়াউর রহমান বগুড়ার বাগবাড়ীতেই জন্মগ্রহণ করেন।
- মনসুর রহমান ও জাহানারা খাতুন: জিয়াউর রহমানের বাবা মনসুর রহমান ছিলেন পেশায় একজন রসায়নবিদ এবং তিনি সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন।
২. দেশভাগ, চাকরি ও করাচিতে স্থানান্তরের প্রেক্ষাপট
মনসুর রহমান ব্রিটিশ আমলে কলকাতার একটি সরকারি দপ্তরে রসায়নবিদ হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
- দেশভাগের প্রভাব (১৯৪৭): ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান বিভক্ত হলে মনসুর রহমান সরকারি চাকরি সূত্রে এবং পরিবারসহ তৎকালীন পাকিস্তানের নতুন রাজধানী করাচিতে স্থানান্তরিত হন।
- জিয়াউর রহমানের শৈশব ও শিক্ষা: জিয়াউর রহমানও তখন বাবার কর্মস্থল সূত্রে করাচিতে যান এবং সেখানেই তাঁর স্কুল শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
- কবরের অবস্থান: ১৯৪৭ সালের পর মনসুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী জাহানারা খাতুন (তারেক রহমানের দাদা ও দাদি) করাচীতেই স্থায়িভাবে বসবাস শুরু করেন এবং পরবর্তী সময়ে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই তাঁদের দাফন করাচিতে সম্পন্ন হয়।
৩. ইতিহাসে পৈতৃক শিকড় ও দাফনের স্থানের বৈচিত্র্যের নজির

পৈতৃক শিকড় বা জন্মভূমি এক জায়গায়, কিন্তু জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে দাফন বা শেষ শয্যা অন্য দেশে হওয়া ইতিহাসে কোনো বিরল ঘটনা নয়। মানব ইতিহাসের হাজার বছর ধরে যুদ্ধ, রাজনৈতিক নির্বাসন, সাম্রাজ্য বিস্তার, পেশাগত কারণ এবং দেশভাগের মতো ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে অসংখ্য বিখ্যাত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এমন বৈচিত্র্য দেখা গেছে।
| ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব | পৈতৃক শিকড় / জন্মস্থান | শেষ জীবন / সমাহিত হওয়ার স্থান |
| কাজী নজরুল ইসলাম | চুরুলিয়া, বর্ধমান (ভারত) | ঢাকা, বাংলাদেশ |
| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | পূর্ববঙ্গের জমিদারি অঞ্চল (শিলাইদহ/শাহজাদপুর) | কলকাতা, ভারত |
| শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক-এর পরিবার: শিকড় বাকেরগঞ্জ (বরিশাল), চাচার কবর কলকাতায় | বরিশাল | বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের পৈতৃক শিকড় বর্তমান বাংলাদেশের বরিশাল (তৎকালীন বাকেরগঞ্জ) অঞ্চলে হলেও তাঁর চাচা ও ওস্তাদ ওবায়দুল্লাহ আল ওবায়দি সুরাওয়ার্দীর মতো পরিবারের অনেক সদস্যের কর্মজীবন ও শেষ শয্যা হয়েছিল তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায়। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী এবং বড় শহরের কেন্দ্রিকতার কারণে এটি ঘটেছিল। |
| মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ | গুজরাট (ভারত) | করাচি, পাকিস্তান |
| হযরত ইব্রাহিম (আ.) | মেসোপটেমিয়া (ইরাক) | হেবরন (ফিলিস্তিন/ইসরায়েল) |
ইতিহাসের পাতা থেকে পৈতৃক শিকড় ও দাফনের স্থানের বৈচিত্র্যের আরো ৪ টি উল্লেখযোগ্য নজির নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর: পৈতৃক শিকড় দিল্লি, দাফন ইয়াঙ্গুন (মিয়ানমার)
মুঘল রাজবংশের পৈতৃক শিকড় ছিল ভারতের দিল্লি এবং আগ্রা কেন্দ্রিক। তবে সিপাহি বিদ্রোহের (১৮৫৭) পর ব্রিটিশরা শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে রেঙ্গুনে (বর্তমান ইয়াঙ্গুন, মিয়ানমার) নির্বাসিত করে। ১৮৬২ সালে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয় এবং ব্রিটিশরা অত্যন্ত গোপনে একটি গ্যারিসনের কাছে তাঁকে সমাহিত করে। বর্তমান যুগেও তাঁর মাজার মিয়ানমারে একটি ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান।
২. বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন: পৈতৃক শিকড় জার্মানি, শেষকৃত্য নিউ জার্সি (যুক্তরাষ্ট্র)
সর্বকালের অন্যতম সেরা এই বিজ্ঞানীর পৈতৃক শিকড় ও জন্ম ছিল জার্মানিতে। তবে ১৯৩০-এর দশকে নাৎসি বাহিনীর উত্থান এবং ইহুদি নিধনের প্রেক্ষাপটে তিনি জার্মানি ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে নিউ জার্সির প্রিন্সটনে তাঁর মৃত্যু হয় এবং তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী কোনো জাঁকজমকপূর্ণ কবর না বানিয়ে মৃতদেহ পুড়িয়ে ছাই বাতাসে উড়িয়ে দেওয়া হয়।
৩. কার্ল মার্ক্স: পৈতৃক শিকড় জার্মানি, দাফন লন্ডন (যুক্তরাজ্য)
সমাজতন্ত্রের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা কার্ল মার্ক্সের পৈতৃক শিকড় ও জন্ম ছিল জার্মানির প্রুশিয়ায়। তাঁর বৈপ্লবিক রাজনৈতিক লেখার কারণে তিনি জার্মানি, ফ্রান্স ও বেলজিয়াম থেকে বহিষ্কৃত হন। জীবনের শেষ তিন দশক তিনি লন্ডনে কাটান এবং ১৮৮৩ সালে সেখানেই মারা যান। লন্ডনের বিখ্যাত হাইগেট সেমেটারিতে (Highgate Cemetery) তাঁর সমাধি অবস্থিত।
৪. মুঘল সম্রাট বাবর: পৈতৃক শিকড় ফারগানা (উজবেকিস্তান), জন্ম ও মৃত্যু ভারত, চূড়ান্ত দাফন কাবুল (আফগানিস্তান)
মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের পৈতৃক শিকড় ছিল মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তানের ফারগানা উপত্যকায়। তিনি ভারত জয় করে সাম্রাজ্য গড়েন এবং ১৫৩০ সালে ভারতের আগ্রায় মারা যান। প্রথমে তাঁকে আগ্রার আরামবাগে দাফন করা হলেও, তাঁর পূর্ব ইচ্ছা অনুযায়ী পরবর্তীতে তাঁর দেহাবশেষ আফগানিস্তানের কাবুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং “বাগ-ই-বাবর” (বাবরের বাগান) নামক স্থানে চূড়ান্তভাবে সমাহিত করা হয়।
এই বৈচিত্র্যের মূল কারণগুলো কী কী?
- ভূ-রাজনৈতিক সীমানা পরিবর্তন: ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগ বা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতার মতো ঘটনার কারণে বহু মানুষের পৈতৃক ভিটা এক দেশে আর বর্তমান নাগরিকত্ব বা শেষ ঠিকানা অন্য দেশে পরিণত হয়েছে।
- পেশাগত স্থানান্তর: ব্রিটিশ আমল বা পাকিস্তান আমলে চাকুরিসূত্রে এক অঞ্চলের মানুষ অন্য অঞ্চলে গিয়ে স্থায়ী হয়েছেন এবং সেখানেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন।
- রাজনৈতিক নির্বাসন: ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বা যুদ্ধের কারণে ইতিহাসের বহু রাজপরিবার বা রাজনৈতিক নেতাকে নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে হয়েছে এবং সেখানেই সমাহিত হতে হয়েছে।
মূল নির্যাস
পৈতৃক শিকড়, জন্মস্থান, বসবাসের স্থান, কর্মস্থল, মৃত্যুর স্থান এবং সমাহিত হওয়ার স্থান—এই ছয়টি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কোনো ব্যক্তির পরিবারের কেউ ভিন্ন দেশে সমাহিত হওয়া মানে এই নয় যে তাঁর ঐতিহাসিক বা পারিবারিক পৈতৃক শিকড় বদলে গেছে। তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও বগুড়া তাঁর বংশানুক্রমিক পৈতৃক মাটি, আর করাচীতে তাঁর দাদা-দাদির সমাহিত হওয়াটা ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং সরকারি চাকরির ঐতিহাসিক স্থানান্তরের একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদনের শিরোনাম: মহান মুক্তিযুদ্ধ: প্রথম শহীদ, বীরশ্রেষ্ঠদের রক্তক্ষয়ী আত্মত্যাগ ও বীরত্বগাথা
- প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় ঐতিহ্য
- প্রকাশের তারিখ: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম ও জাতীয় ইতিহাস মহাফেজখানা।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, কোটি মানুষের ত্যাগ এবং হাজারো অকুতোভয় সেনানী ও সাধারণ মানুষের বীরত্বগাথার ঐতিহাসিক মহাকাব্য। ১৯৭১ সালের প্রতিরোধ আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বরের চূড়ান্ত বিজয়—বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের প্রতিটি ধাপে জড়িয়ে রয়েছে রক্তঝরা ইতিহাস।
১. স্বাধীনতা সংগ্রামের রক্তিম সূচনা: প্রথম শহীদ শঙ্কু সমজদার

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ—বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সারা দেশে তখন তীব্র অসহযোগ আন্দোলন ও সর্বাত্মক হরতাল চলছিল। সেদিন রংপুরের কাচারি বাজার থেকে স্বাধিকারের দাবিতে বের হওয়া এক উত্তাল মিছিলে যোগ দিয়েছিল কৈলাশ রঞ্জন স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ১২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী শঙ্কু সমজদার।
মিছিলটি আলমনগর ও জাহাজ কোম্পানির মোড় অতিক্রম করার সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী অ-বাঙালিদের অতর্কিত গুলিতে রক্তে ভেসে যায় রাজপথ। ঘটনাস্থলেই অকাতরে প্রাণ ঢেলে দেন কিশোর শঙ্কু। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি-ই মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ ও প্রথম শিশু শহীদ। পরবর্তীতে ২০১২ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁকে এই ঐতিহাসিক মর্যাদা প্রদান করা হয়।
২. সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রতীক: সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব ও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ সাতজন মহান সন্তানকে দেওয়া হয় দেশের সর্বোচ্চ সামরিক পদক ‘বীরশ্রেষ্ঠ’।
- প্রথম ও শেষ শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ: মুক্তিযুদ্ধে সর্বপ্রথম শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ হলেন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) ল্যান্স নায়ক মুন্সী আব্দুর রউফ (৮ এপ্রিল, ১৯৭১)। তবে সাধারণ জ্ঞানের অনেক ক্ষেত্রে অপশনে তাঁর নাম না থাকলে সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামালকে (১৮ এপ্রিল, ১৯৭১) বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে, বিজয়ের মাত্র দুই দিন আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জে শত্রুর মুখোমুখি যুদ্ধে শহীদ হন সর্বশেষ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর (১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১)।
সাত বীরশ্রেষ্ঠর সংক্ষেপিত পরিচিতি ও সমাধিস্থল
| নাম ও পদবি | বাহিনী ও সেক্টর | শাহাদাতের তারিখ | চিরনিদ্রায় শায়িত যেখানে |
| ল্যান্স নায়ক মুন্সী আব্দুর রউফ | ইপিআর (১ নং সেক্টর) | ৮ এপ্রিল, ১৯৭১ | বুড়িঘাট, নানিয়ারচর, রাঙামাটি |
| সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল | সেনাবাহিনী (২ নং সেক্টর) | ১৮ এপ্রিল, ১৯৭১ | দরুইন গ্রাম, আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া |
| ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান | বিমানবাহিনী | ২০ আগস্ট, ১৯৭১ | মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, ঢাকা |
| ল্যান্স নায়ক নূর মোহাম্মদ শেখ | ইপিআর (৮ নং সেক্টর) | ৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ | কাশীপুর, শার্শা, যশোর |
| সিপাহী মোহাম্মদ হামিদুর রহমান | সেনাবাহিনী (৪ নং সেক্টর) | ২৮ অক্টোবর, ১৯৭১ | মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, ঢাকা |
| ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার-১ মোহাম্মদ রুহুল আমিন | নৌবাহিনী (১০ নং সেক্টর) | ১০ ডিসেম্বর, ১৯৭১ | বাগমারা, রূপসা, খুলনা |
| ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর | সেনাবাহিনী (৭ নং সেক্টর) | ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১ | সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ |
৩. ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরের ঐতিহাসিক শাহাদাত

পাকিস্তানের রিসালপুর থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন ৭ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর। ডিসেম্বরের শুরুতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শত্রুমুক্ত করার অভিযানের নেতৃত্ব দেন তিনি।
১৪ ডিসেম্বর সকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক দোতলা ভবন থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি ভারী মেশিনগান থেকে অবিরাম গুলি বর্ষণ হচ্ছিল, যা মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে এগুনো অসম্ভব করে তোলে। এই সংকটময় মুহূর্তে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর এক হাতে এসএমজি এবং অন্য হাতে গ্রেনেড নিয়ে বুক ডলে হামাগুড়ি (ক্রলিং) দিয়ে শত্রুর বাঙ্কারের একদম কাছে পৌঁছে যান। প্রখর নিশানায় গ্রেনেড ছুঁড়ে শত্রুর মেশিনগান পোস্টটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেন তিনি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ঠিক সেই মুহূর্তেই পাশের ভবন থেকে এক পাকিস্তানি স্নাইপারের বুলেট তাঁর কপালে এসে বিদ্ধ হয়। দেশের এই অকুতোভয় বীর বাঙ্কারের সামনেই শাহাদাতবরণ করেন, যার পরদিনই (১৫ ডিসেম্বর) চাঁপাইনবাবগঞ্জ সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয়।
৪. রণাঙ্গনের অবিশ্বাস্য সব বীরত্বগাথা

- নৌ-কমান্ডোদের ‘অপারেশন জ্যাকপট’: ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে খালি গায়ে, পায়ে ফিন্স ও বুকে লিম্পেট মাইন বেঁধে সাঁতরে গিয়ে চট্টগ্রাম, মংলা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ বন্দরে একযোগে হামলা চালান বীর নৌ-কমান্ডোরা। তাঁদের গুঁড়িয়ে দেওয়া ২৬টি ধান ও অস্ত্রবাহী জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে যায় বিশ্ব।
- ঢাকার বুকে আতঙ্কের নাম ‘ক্র্যাক প্লাটুন’: ঢাকার তরুণ গেরিলা যোদ্ধাদের গঠিত ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ অবরুদ্ধ রাজধানীতে একের পর এক দুঃসাহসিক অপারেশন চালায়। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বড় বড় নিরাপত্তা চৌকিতে তাদের সফল গ্রেনেড হামলা পাকিস্তানি বাহিনীকে সার্বক্ষণিক আতঙ্কে রাখত।
- অস্ত্র হাতে নারীদের প্রতিরোধ: তারামন বিবি (বীর প্রতীক) সরাসরি রণাঙ্গনে শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছেন। ডা. সিতারা বেগম ফিল্ড হাসপাতাল পরিচালনা করে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন বাঁচিয়েছেন এবং অমানবিক নির্যাতন সহ্য করেও কাঁকন বিবি বিশটিরও বেশি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন।
- স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র: ইথারের তরঙ্গে ‘চরমপত্র’ (এম আর আখতার মুকুল) এবং উদ্দীপনামূলক দেশাত্মবোধক গানগুলো ছিল রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের জন্য আসল অক্সিজেন।
- বিদেশী বন্ধুদের অবদান: জর্জ হ্যারিসন ও পণ্ডিত রবিশঙ্করের ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয়। এছাড়া বাটা সু কোম্পানির অস্ট্রেলীয় কর্মকর্তা ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ড গোপনে অস্ত্র ও তথ্য দিয়ে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন, যিনি একমাত্র বিদেশী হিসেবে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত হন।
উপসংহার
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো উপহার ছিল না; এটি ছিল সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, নারী ও অকুতোভয় সেনাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এক লাল-সবুজ পতাকা। আজ আমরা যে স্বাধীন দেশে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, তা শঙ্কু সমজদার থেকে শুরু করে সাত বীরশ্রেষ্ঠ এবং ৩০ লাখ শহীদের মহান আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



