জাতীয়

চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ফায়ারিং অনুশীলনে ট্যাংক দুর্ঘটনা: দুই সেনাসদস্য নিহত, কর্মকর্তা গুরুতর আহত
ট্যাংক দুর্ঘটনা

নিউজ ডেস্ক

September 10, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
বিভাগ (Category): জাতীয়
প্রকাশের তারিখ: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
তথ্যসূত্র (Sources): আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর), দ্য ডেইলি অবজারভার, ইত্তেফাক, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, নিউজবাংলা২৪

চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি নিয়মিত ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলন চলাকালে একটি ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের সময় আকস্মিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এই দুর্ঘটনায় সেনাবাহিনীর দুইজন সৈনিক নিহত হয়েছেন এবং একজন কর্মকর্তা গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। ঘটনাটির মূল বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

  • নিহত সেনাসদস্যদের পরিচয়: দুর্ঘটনায় নিহত দুই সৈনিক হলেন নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার আবু বকর সিদ্দিক ওরফে পিয়াস এবং রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার তাসনিম রিফাত। তাদের নিজ নিজ এলাকায় পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।
  • আহত কর্মকর্তার চিকিৎসা: দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত সেনা কর্মকর্তাকে উন্নত ও জরুরি চিকিৎসার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) স্থানান্তর করা হয়েছে।
  • তদন্ত কার্যক্রম: ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের সময় ঠিক কী কারণে এই আকস্মিক বিস্ফোরণ বা দুর্ঘটনা ঘটেছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। আইএসপিআর জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সঠিক কারণ অনুসন্ধানে সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয় তদন্ত কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে।
  • ট্যাংকের মডেল: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমের রিপোর্টে ট্যাংকটিকে চীন থেকে আনা টাইপ ৫৯ মডেলের ট্যাংক বলে দাবি করা হলেও সেনাবাহিনীর অফিশিয়াল বিবৃতিতে নির্দিষ্ট কোনো মডেলের কথা নিশ্চিত করা হয়নি।

ঘটনার বিবরণ

চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জের ট্যাংক দুর্ঘটনার তদন্ত সংক্রান্ত বিষয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত নতুন কোনো বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।

আইএসপিআর-এর সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে তদন্ত কার্যক্রমের বর্তমান পরিস্থিতি নিচে দেওয়া হলো:

  • তদন্তের বর্তমান অবস্থা: সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় এই দুর্ঘটনার মূল কারণ অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় তদন্ত এবং কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখনো চলমান রয়েছে। ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের সময় ঠিক কী ধরণের যান্ত্রিক ত্রুটি বা আকস্মিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা সুনির্দিষ্টভাবে বের করার চেষ্টা চলছে।
  • অফিশিয়াল অবস্থান: সাধারণত সেনাবাহিনীর এই ধরণের অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে এবং সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করতে কিছুটা সময় লাগে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আইএসপিআর বা সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দুর্ঘটনার কোনো প্রাথমিক অনুমান বা আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
  • ট্যাংকের বিষয়: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে চীনের তৈরি টাইপ ৫৯ মডেলের ট্যাংকের গোলার বিস্ফোরণ নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা তৈরি হলেও, সেনাবাহিনীর তদন্ত কমিটি এই বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিলমোহর বা মন্তব্য দেয়নি।

চীনের তৈরি টাইপ ৫৯ মডেলের ট্যাংক বিস্তারিত

চীনের তৈরি টাইপ ৫৯ মডেলের ট্যাংক হলো মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের বিখ্যাত টি-৫৪এ ট্যাংকের একটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত নকশার সংস্করণ। ১৯৫০-এর দশকে চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক চুক্তির অংশ হিসেবে এই প্রযুক্তিগত সহযোগিতা শুরু হয়েছিল । ১৯৫৯ সালে এই মডেলটি আনুষ্ঠানিকভাবে চীনা সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়, যার ফলে এর নামকরণ করা হয় টাইপ ৫৯ ।

এই মডেলের প্রধান কিছু বৈশিষ্ট্য এবং ইতিহাস নিচে দেওয়া হলো:

  • উৎস ও উৎপাদন: এটি চীনের প্রথম নিজস্ব কারখানায় উৎপাদিত মাঝারি সারির প্রধান যুদ্ধ ট্যাংক (মেইন ব্যাটল ট্যাংক) । চীনের ইনার মঙ্গোলিয়ার বাওতু-তে অবস্থিত ফ্যাক্টরি ৬১৭ (যা বর্তমানে নরিনকো নামে পরিচিত) এই ট্যাংকটি তৈরি শুরু করে । ১৯৫৯ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৯ হাজারেরও বেশি এই মডেলের ট্যাংক উৎপাদিত হয়েছিল ।
  • মূল নকশা ও অস্ত্রশস্ত্র: প্রাথমিক সংস্করণে এই ট্যাংকের ওজন ছিল প্রায় ৩৬ টন । এতে ১০০ মিলিমিটারের একটি রাইফেলড মেইন গান বা প্রধান কামান ব্যবহার করা হতো । পরবর্তীতে বিভিন্ন সংস্করণে এটি আধুনিকায়ন করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ১০৫ মিলিমিটার বা তার চেয়ে শক্তিশালী কামান যুক্ত করা হয়
  • বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ব্যবহার: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে প্রথম চীন থেকে টাইপ ৫৯ ট্যাংক সংগ্রহ করে । পরবর্তীতে পুরোনো এই মডেলগুলোকে অবসরে না পাঠিয়ে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) মাধ্যমে বড় ধরণের আধুনিকায়ন করা হয় । এই আধুনিকায়নের পর ট্যাংকগুলোর নতুন নামকরণ করা হয় টাইপ ৫৯জি ‘দুর্জয়’ । এই আপগ্রেডেড সংস্করণে চীনা প্রযুক্তির সহায়তায় ১২৫ মিলিমিটারের স্মুথবোর গান এবং আধুনিক ফায়ার কন্ট্রোল সিস্টেম যুক্ত করা হয়েছে
  • আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি: কয়েক দশক ধরে চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মির সাঁজোয়া বহরের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করা এই legacy মডেলটি বিশ্বের বহু দেশে রপ্তানি করা হয়েছে । বর্তমানে বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তান, ইরান, সুদান এবং উত্তর ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো এই ট্যাংক বা এর বিভিন্ন আধুনিক সংস্করণ ব্যবহার করে আসছে ।

চীনের তৈরি টাইপ ৫৯ মডেলের ট্যাংক বিস্তারিত আর কেন এটি দিয়ে একটা এক্সিডেন্ট হল বা হতে পারে বলে মনে হয়?

চীনের তৈরি টাইপ ৫৯ মডেলের ট্যাংক এবং কেন এই ধরণের সামরিক যানে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, তার বিস্তারিত কারণ নিচে দেওয়া হলো।

টাইপ ৫৯ ট্যাংকের বিস্তারিত কারিগরি বিবরণ:

  • সোভিয়েত নকশার রূপান্তর: ১৯৫০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের টি-৫৪এ ট্যাংকের নকশা অনুসরণ করে চীন এই ট্যাংকটি তৈরি করে । ১৯৫৯ সাল থেকে চীনা সেনাবাহিনীতে এটি যুক্ত হওয়ার পর থেকে এটি বিশ্বজুড়ে সাশ্রয়ী ও টেকসই একটি যুদ্ধযান হিসেবে পরিচিতি পায় ।
  • মূল কাঠামো ও অস্ত্র: সাধারণ সংস্করণে এই ট্যাংকের ওজন প্রায় ৩৬ টন এবং এতে ১০০ মিলিমিটারের একটি রাইফেলড মেইন গান বা কামান থাকে । তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ বিশ্বের অনেক দেশই সময়ের সাথে সাথে এর কামান পরিবর্তন করে ১০৫ মিলিমিটার বা ১২৫ মিলিমিটারের শক্তিশালী কামান এবং আধুনিক ফায়ার কন্ট্রোল সিস্টেম যুক্ত করেছে ।
  • বর্ম বা আর্মার সুরক্ষা: এর মূল বর্মটি স্টিলের তৈরি, যা আধুনিক ট্যাংকগুলোর মতো কম্পোজিট বা রিয়্যাক্টিভ আর্মার দিয়ে তৈরি নয় । ফলে ট্যাংকের ভেতরে কোনো বিস্ফোরণ ঘটলে তার ধাক্কা ভেতরের ক্রুদের ওপর খুব মারাত্মকভাবে পড়ে।

এই ট্যাংকে কেন দুর্ঘটনা ঘটল বা ঘটতে পারে বলে মনে হয়:

হাটহাজারীর সাম্প্রতিক ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধানে সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের কারিগরি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তবে সামরিক সাঁজোয়া যান এবং বিশেষ করে টাইপ ৫৯ মডেলের মতো ট্যাংকের ক্ষেত্রে ফায়ারিংয়ের সময় যেসব কারণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে তার সম্ভাব্য কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • কামানের নলে অকাল বিস্ফোরণ (বোর প্রিম্যাচিউর ডিটonation): ফায়ারিংয়ের সময় গোলাটি যখন ট্যাংকের কামানের নল বা ব্যারেল দিয়ে বের হতে যায়, তখন নলের ভেতরেই সেটি আকস্মিকভাবে বিস্ফোরিত হতে পারে । নলের ভেতরে কোনো ময়লা, আগের ফায়ারিংয়ের অবশিষ্টাংশ কিংবা ত্রুটি থাকলে এমনটি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
  • মেকানিক্যাল ফ্যাটিগ বা ধাতব ক্লান্তি: টাইপ ৫৯ একটি পুরোনো প্রযুক্তির ট্যাংক । দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে এর কামানের ব্রিচ ব্লক (যে অংশটি গোলা লোড করার পর পেছনের অংশ লক করে দেয়) বা ব্যারেলের ভেতরের ধাতব অংশ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে । ফায়ারিংয়ের প্রচণ্ড চাপ সহ্য করতে না পেরে যদি লকিং সিস্টেম ফেইল করে, তবে ভেতরের তীব্র গ্যাস ও আগুন ট্যাংকের ভেতরেই ছড়িয়ে পড়ে।
  • গোলাবারুদের গুণগত মান বা ফিউজের ত্রুটি: অনেক সময় গোলার পেছনের অংশে থাকা প্রাইমার বা ফিউজে ত্রুটি থাকলে লোড করার সময় বা ফায়ারিংয়ের মুহূর্তে অনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। গোলার সেলটি যদি নির্ধারিত সময়ের আগে সক্রিয় হয়ে যায়, তবে তা ট্যাংকের ভেতরে থাকা ক্রুদের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনে।
  • ওভারপ্রেশার বা ব্যাকফায়ার: কামানের গোলা ছোঁড়ার পর যে বিশাল পরিমাণ গ্যাস তৈরি হয়, তা যদি ব্যারেল দিয়ে সঠিকভাবে সামনে বের হতে না পারে, তবে তা উল্টো ভেতরের দিকে ব্যাকফায়ার করে । এতে ট্যাংকের ছোট কামরার ভেতরে মুহূর্তের মধ্যে অক্সিজেন শেষ হয়ে যায় এবং তীব্র বিস্ফোরণ ঘটে।

সেনাবাহিনীর তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরই কেবল জানা যাবে যে যান্ত্রিক ত্রুটি, গোলাবারুদের সমস্যা নাকি অন্য কোনো বিশেষ পরিস্থিতির কারণে হাটহাজারীতে এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল [

প্রেক্ষাপট

ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলন সামরিক বাহিনীর নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে যুদ্ধাস্ত্র পরিচালনার দক্ষতা যাচাই ও উন্নয়ন করা হয়। তবে অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে কাজ করার কারণে এ ধরনের প্রশিক্ষণে ঝুঁকিও থেকে যায়, যা বিশ্বের যেকোনো পেশাদার সামরিক বাহিনীর জন্যই একটি বাস্তবতা। এই দুর্ঘটনা সেই ঝুঁকিরই একটি মর্মান্তিক উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।

উপসংহার

তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয়। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি নিয়ে হালনাগাদ তথ্য জানানো হবে।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সংবিধান দিবস

নিউজ ডেস্ক

November 4, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৪ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: জাতীয়
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ গণপরিষদের কার্যবিবরণী, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের সংবিধানের মূল প্রস্তাবনা। 

আজ ৪ নভেম্বর, ঐতিহাসিক ‘বাংলাদেশ সংবিধান দিবস’। ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ সময় এই দিনটি উপেক্ষিত থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭২ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন তথা সংবিধান গণপরিষদে গৃহীত হয়েছিল। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ১১ মাসের মাথায় কীভাবে একটি বিশ্বমানের ও যুগোপযোগী সংবিধান লাভ করেছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। নিচে বাংলাদেশের সংবিধান রচনা ও গ্রহণের সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বিস্তারিত তুলে ধরা হলো। 

১. পটভূমি ও গণপরিষদ আদেশ জারি
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করার পর একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নিজস্ব আইনি কাঠামোর প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন। এর পরদিনই অর্থাৎ ১১ জানুয়ারি তিনি ‘অস্থায়ী সংবিধান আদেশ’ জারি করেন। এর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তন করা হয়। 

পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ’ জারি করা হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে এই গণপরিষদ গঠিত হয়, যার মূল দায়িত্ব ছিল দেশের জন্য একটি স্থায়ী সংবিধান প্রণয়ন করা। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। 

২. খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন
গণপরিষদের দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘সংবিধান প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটিতে একমাত্র নারী সদস্য ছিলেন বেগম রাজিয়া বানু। এছাড়া তৎকালীন বিরোধী দলের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। 

কমিটি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাদের কাজ শুরু করে। বিভিন্ন দেশের সংবিধান পর্যালোচনা এবং দেশের আপামর জনসাধারণের মতামত সংগ্রহের জন্য তারা ব্যাপক উদ্যোগ নেন। সর্বস্তরের জনগণের কাছ থেকে মোট ৯৮টি লিখিত প্রস্তাব সংগ্রহ করা হয়েছিল। ভারত ও যুক্তরাজ্যের সংবিধানকে মূল ভিত্তি ধরে খসড়া তৈরির কাজ এগিয়ে চলে। 

৩. খসড়া উত্থাপন ও বিতর্ক
দীর্ঘ কঠোর পরিশ্রমের পর ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ড. কামাল হোসেন খসড়া সংবিধান বিল আকারে উত্থাপন করেন। ১৯ অক্টোবর থেকে এর ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয়। 

সংবিধানের প্রতিটি অনুচ্ছেদ ও ধারা নিয়ে গণপরিষদে ব্যাপক বিতর্ক ও আলোচনা হয়। গণপরিষদের সদস্যরা বিভিন্ন সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। মোট ৪১টি অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনার পর সংবিধানের প্রতিটি বিষয়কে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়। 

৪. সংবিধান গ্রহণ ও কার্যকর
অবশেষে ৪ নভেম্বর, ১৯৭২ সালে গণপরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে ‘বাংলাদেশের সংবিধান’ গৃহীত হয়। সংবিধান গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, “এই সংবিধান শহীদের রক্তে লিখিত, এ সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।” 

এর ঠিক দেড় মাস পর, অর্থাৎ বিজয়ের প্রথম বার্ষিকী—১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭২ থেকে এই সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়। সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপিটি ছিল হাতে লেখা, যা শিল্পী হাশেম খানের নকশায় এবং প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফার আবদুর রউফের হাতের লেখায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। এতে স্বাক্ষর করেছিলেন গণপরিষদের সদস্যবৃন্দ। 


একটি দেশের সংবিধান কেবল কিছু আইনের সমষ্টি নয়, এটি রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের সংবিধানের মূল স্তম্ভ ছিল চারটি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। সময়ের আবর্তে এই সংবিধানে বহু পরিবর্তন ও সংশোধনী আনা হলেও, ৪ নভেম্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সবসময়ই অনস্বীকার্য। তরুণ প্রজন্মের জন্য নিজেদের অধিকার ও রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা বুঝতে সংবিধান রচনার এই ইতিহাস জানা অত্যন্ত জরুরি। 

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

জেল হত্যা দিবস

নিউজ ডেস্ক

November 4, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৩ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইতিহাস
তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট, বণিক বার্তা, প্রথম আলো, বিডিনিউজ২৪, বাংলা ট্রিবিউন ও যুগান্তরের প্রতিবেদন এবং আদালতের রায়-সংক্রান্ত সংবাদ প্রতিবেদন 

৩ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গভীর ক্ষত, অন্ধকারের दिन এবং দ্বিতীয় কলঙ্কময় অধ্যায়, যা ‘জেল হত্যা দিবস’ হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নিরাপদ প্রকোষ্ঠে বন্দি অবস্থায় স্বাধীন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। 

এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার চার জাতীয় নেতা হলেন: 

  • সৈয়দ নজরুল ইসলাম (মুজিবনগর সরকারের সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি) 
  • তাজউদ্দীন আহমদ (বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী) 
  • ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী (মুজিবনগর সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী ও পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী) 
  • এ এইচ এম কামারুজ্জামান (মুজিবনগর সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী) 

নেপথ্যের প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক ক্রান্তিকাল
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে একদল সেনা সদস্য। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। তৎকালীন এই খুনি সরকার আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে, যার ধারাবাহিকতায় এই শীর্ষ চার নেতাকেও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়। 

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে খন্দকার মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে একটি পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান (Counter-coup) শুরু হয়। খুনি চক্র বুঝতে পেরেছিল যে তাদের পতন আসন্ন। যদি আওয়ামী লীগের এই শীর্ষ চার নেতা জীবিত থাকেন, তবে তারা পুনরায় দেশের হাল ধরবেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ পরিচালিত হবে। তাই দেশকে সম্পূর্ণ নেতৃত্বহীন ও অভিভাবকহীন করার চূড়ান্ত নীল নকশা হিসেবে কারাগারে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। 

সেই ভয়াল রাতে কারাগারে যা ঘটেছিল
৩ নভেম্বর ভোররাত আনুমানিক ৪টার দিকে খাকি পোশাক পরিহিত এবং স্টেনগান ও এসএলআর (SLR)-এ সজ্জিত পাঁচজন সেনাসদস্য একটি পিকআপ ভ্যানে করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আসে। এদের নেতৃত্বে ছিলেন রিসালদার মোসলেম উদ্দিন। 

তৎকালীন উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজনস) কাজী আবদুল আউয়াল প্রথমে তাদের কারাগারে ঢুকতে বাধা দেন। তবে বঙ্গভবন থেকে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদের সরাসরি নির্দেশ পাওয়ার পর কারা কর্তৃপক্ষ খুনিদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়। এরপর জেলার আমিনুর রহমানকে নির্দেশ দেওয়া হয় আলাদা আলাদা সেলে থাকা চার নেতাকে ডেকে এনে একটি কক্ষে একত্রিত করার জন্য। চার নেতাকে একটি কক্ষে একত্র করার পর ঘাতকেরা তাদের ওপর ব্রাশফায়ার করে। গুলি করার পর মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাদের শরীর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয়। 

মামলার এজাহার (FIR) ও তদন্তের বিবরণ
হত্যাকাণ্ডের পরদিন, অর্থাৎ ৪ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে তৎকালীন ডিআইজি প্রিজনস কাজী আবদুল আউয়াল বাদী হয়ে লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। 

মামলার প্রথম তথ্য বিবরণী বা এজাহারে (FIR) উল্লেখ করা হয় যে, ৩ নভেম্বর ভোররাতে রাষ্ট্রপতির মৌখিক নির্দেশের কথা বলে কয়েকজন অবাধ্য সেনাসদস্য জোরপূর্বক কারাগারে প্রবেশ করে। তারা তৎকালীন জেনারেলে সেলে বন্দি জাতীয় চার নেতাকে এক কক্ষে জড়ো করে স্টেনগান ও রাইফেল দিয়ে ব্রাশফায়ার করে নির্মমভাবে হত্যা করে। 

মামলার পর তৎকালীন উপ-পুলিশ সুপার সাইফুদ্দিন আহমেদকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হলেও তাকে কারাগারে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে সামরিক সরকারগুলোর অনীহার কারণে দীর্ঘ ২১ বছর মামলার নথিপত্র, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং বিচার বিভাগীয় কমিশনের ফাইল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে গায়েব করে দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে আইনগত বাধা দূর হওয়ার পর সিআইডি (CID)-র তৎকালীন কর্মকর্তা আব্দুল কাহাত আকন্দ নতুনভাবে তদন্তভার গ্রহণ করেন এবং ১৯৯৮ সালে ২৩ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করেন। 

তৎকালীন আইনি নথি ও আদালতের চূড়ান্ত রায়
দীর্ঘ আইনি জটিলতা শেষে বিচারিক আদালত ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক সর্বমোট ১৫ জন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেওয়া হয়: 

  • মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি (৩ জন): সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকায় দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, দফাদার মারফত আলী শাহ এবং দফাদার আবুল হাসেম মৃধাকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। 
  • যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি (১২ জন): অপরাধের ষড়যন্ত্র ও সহযোগিতার জন্য (দণ্ডবিধির ৩০২/১০৯ ধারা) খন্দকার আব্দুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা, রাশেদ চৌধুরী, আহমেদ শরিফুল হোসেন, আব্দুল মাজেদ, মোহাম্মদ কিসমত হাশেম এবং নাজমুল হোসেন আনসারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। 

(উল্লেখ্য, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে ফারুক রহমান, শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা ও মহিউদ্দিন আহমেদকে অন্য একটি মামলা অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে)। 

২০০৮ সালের হাইকোর্টের বিতর্কিত রায় ও ২০১৩ সালের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন
২০০৪ সালের বিচারিক (নিম্ন) আদালত রায় দিলেও ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে (تৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে) হাইকোর্ট বিভাগ এই মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর একটি অত্যন্ত বিতর্কিত রায় প্রদান করেন। 

হাইকোর্টের তৎকালীন বেঞ্চ নিম্ন আদালতের রায় সংশোধন করে কেবল ১ জন আসামির (রিসালদার মোসলেম উদ্দিন) মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। অন্যদিকে, নিম্ন আদালত কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য ২ জন আসামি—দফাদার মারফত আলী শাহ এবং দফাদার আবুল হাসেম মৃধাকে সম্পূর্ণ খালাস দেওয়া হয়। সেই সাথে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ৪ জন আসামি—সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা এবং এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদকেও এই মামলা থেকে খালাস দেওয়া হয়। আদালতের যুক্তি ছিল, এই চারজনের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রে সরাসরি জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ প্রসিকিউশন উপস্থাপন করতে পারেনি। 

২০০৯ সালে এই বিতর্কিত রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি) দায়ের করা হয়। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ হাইকোর্টের ২০০৮ সালের রায়টিকে আইনি ভিত্তির অভাব ও ভুল পর্যালোচনার কারণে সম্পূর্ণ বাতিল (Dismiss) করে দেন। 

আপিল বিভাগ তাদের রায়ে উল্লেখ করেন যে, জাতীয় চার নেতাকে হত্যার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। এটি ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতা এবং একই খুনি চক্রের পূর্বপরিকল্পিত রাজনৈতিক নীল নকশা। তাই ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থেকে আসামিদের খালাস দেওয়া আইনগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ ছিল। আপিল বিভাগ ২০০৮ সালের হাইকোর্টের খালাসের সিদ্ধান্ত বাতিল করে ২০০৪ সালের নিম্ন আদালতের মূল রায়টিকেই হুবহু বহাল রাখেন। এর ফলে খালাস পাওয়া দফাদার মারফত আলী শাহ এবং দফাদার আবুল হাসেম মৃধার মৃত্যুদণ্ড পুনরায় পুনর্বহাল হয় এবং বাকিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকে। 

পলাতক আসামিদের বর্তমান অবস্থা ও প্রত্যর্পণের আইনি বাধা
আইনি নথির ১১ জন সাজাপ্রাপ্ত মূল আসামির মধ্যে ১০ জনই দীর্ঘ সময় ধরে পলাতক রয়েছেন এবং ১ জনের সাজা কার্যকর করা হয়েছে। এদের বর্তমান সর্বশেষ অবস্থা নিম্নরূপ: 

১. রিসালদার মোসলেম উদ্দিন (মৃত্যুদণ্ড): পলাতক; ভারতে আত্মগোপনে থাকার গুঞ্জন থাকলেও সুনির্দিষ্ট অবস্থান এখনও অজানা।
২. দফাদার মারফত আলী শাহ (মৃত্যুদণ্ড): পলাতক; তার বর্তমান অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি।
3. দফাদার আবুল হাসেম মৃধা (মৃত্যুদণ্ড): পলাতক; নিখোঁজ ও অবস্থান অজানা।
৪. লে. কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আব্দুর রশিদ (যাবজ্জীবন): পলাতক; লিবিয়া ও পাকিস্তানে বিভিন্ন সময়ে অবস্থান করার তথ্য রয়েছে।
৫. লে. কর্নেল (অব্যাহতি) শরিফুল হক ডালিম (যাবজ্জীবন): পলাতক; পাকিস্তান ও যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হয়।
৬. লে. কর্নেল এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী (যাবজ্জীবন): পলাতক;加拿大য় রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন।
৭. লে. কর্নেল রাশেদ চৌধুরী (যাবজ্জীবন): পলাতক; যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন।
৮. ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসার (যাবজ্জীবন): পলাতক; কানাডায় অবস্থান করছেন।
৯. মেজর (অব.) আহমেদ শরিফুল হোসেন (যাবজ্জীবন): পলাতক; অবস্থান অজ্ঞাত।
১০. াক্যাপ্টেন (অব.) মোহাম্মদ কিসমত হাশেম (যাবজ্জীবন): পলাতক থাকা অবস্থায় কানাডায় মৃত্যুবরণ করেছেন।
১১. ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আব্দুল মাজেদ (যাবজ্জীবন): সাজা কার্যকর। দীর্ঘদিন ভারতে পলাতক থাকার পর ২০২০ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২০২০ সালের ১২ এপ্রিল তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। 

কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসামিদের ফিরিয়ে আনার আইনি বাধা:
লে. কর্নেল এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী কানাডায় এবং লে. কর্নেল রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক থাকলেও দেশ দুটির অভ্যন্তরীণ আইনি জটিলতার কারণে তাদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। 

কানাডার ‘Extradition Act’ (কানাডিয়ান প্রত্যর্পণ আইন) এবং ‘কানাডিয়ান চার্টার অব রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমস’-এর ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী—কানাডা সরকার এমন কোনো দেশে কোনো ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ বা ফেরত পাঠাতে পারে না যেখানে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। যেহেতু নূর চৌধুরী বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, তাই কানাডা তাকে ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। 

অন্যদিকে, রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় (Asylum) নিয়ে অবস্থান করছেন। আমেরিকার আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে নিজ দেশে ফেরত গেলে তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা অবিচারের শিকার হতে পারেন, তবে তাকে সুরক্ষামূলক আশ্রয় দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরত চাওয়ার পর মার্কিন বিচার বিভাগ (DOJ) তার রাজনৈতিক আশ্রয়ের ফাইলটি নতুন করে পর্যালোচনার উদ্যোগ নিলেও, সে দেশের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং আদালতের আপিল ব্যবস্থার কারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও ঝুলে রয়েছে। এছাড়া, বাংলাদেশের সাথে কানাডা বা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো দ্বিপাক্ষিক ও কার্যকর প্রত্যর্পণ চুক্তি (Extradition Treaty) না থাকাও একটি বড় আইনি প্রতিবন্ধকতা। 

জাতীয় চার নেতার রাজনৈতিক সততা, সাহস এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অবিচল আনুগত্য চিরকাল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য প্রেরণা হয়ে থাকবে। 

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

জেল হত্যা দিবস

নিউজ ডেস্ক

November 3, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৩ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইতিহাস
তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট, বণিক বার্তা, প্রথম আলো, বিডিনিউজ২৪, বাংলা ট্রিবিউন ও যুগান্তরের প্রতিবেদন এবং আদালতের রায়-সংক্রান্ত সংবাদ প্রতিবেদন

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত, কারণ নিহত নেতারা মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন এবং তাঁরা রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা অবস্থায় নিহত হন। প্রতি বছর ৩ নভেম্বর জাতীয় এই চার নেতার স্মরণে জেল হত্যা দিবস পালন করা হয়।

পটভূমি

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হন। এর পর এই চার নেতাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড বইয়ে লিখেছেন, শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পরই চার নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। সেই সময় দেশ ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতায়। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরেই মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে একটি পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে। আজ জেলহত্যা দিবস

ঘটনা

৩ নভেম্বর মধ্যরাতে কারাগারের ভেতরে গুলি চালিয়ে চার নেতাকে হত্যা করা হয়। গুলির পর তাঁদের বেয়নেট দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয়। কিছু সূত্র সময়টি মধ্যরাত, কোনোটি ভোরের দিক বলে উল্লেখ করেছে। এই লেখায় আমরা সময়ের সূত্রভেদ নিশ্চিত করিনি।

চার নেতা কারা ছিলেন

নেতাভূমিকা
সৈয়দ নজরুল ইসলামমুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি
তাজউদ্দীন আহমদমুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী
ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীমুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং পরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী
এ এইচ এম কামারুজ্জামানমুজিবনগর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী bonikbartabonikbarta

মামলা ও আদালতের রায়

সময়ঘটনা
৪ নভেম্বর ১৯৭৫তৎকালীন কারা উপমহাপরিদর্শক কাজী আবদুল আউয়াল লালবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন।
১৯৭৫–১৯৯৬মামলার তদন্ত ২১ বছর স্থগিত ছিল।
১৯৯৬মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়
১৫ অক্টোবর ১৯৯৮২৩ বছর পর অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
২০ অক্টোবর ২০০৪ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত তিনজন পলাতক সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড, ১২ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় এবং পাঁচজনকে খালাস দেয়।
পরবর্তী সময়হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত কয়েকজনকে খালাস দেয়।
৩০ এপ্রিল ২০১৩আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করে বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখে। পরে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। জেলহত্যা দিবস আজ

রায়ের পর্যায়ভেদে আসামিদের সংখ্যা ও দণ্ডের বিবরণ বিভিন্ন সূত্রে সামান্য আলাদাভাবে এসেছে। এই লেখায় সূত্রে যেগুলো স্পষ্ট ও পরস্পরের সঙ্গে মেলে, কেবল সেগুলোই রাখা হয়েছে। বিস্তারিত তথ্যের জন্য সুপ্রিম কোর্টের প্রকাশিত রায় দেখুন।

দিবসটি কেন স্মরণীয়

ঘটনাটি রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা বন্দীদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক হত্যার বিচারে দীর্ঘ বিলম্বের একটি উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়। রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা অবস্থায় কারাগারের মতো সুরক্ষিত স্থানে চার নেতাকে হত্যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে বলে বিবেচিত। ইতিহাসের এই অধ্যায় নিয়ে মূল্যায়ন ও ব্যাখ্যায় ভিন্নমত থাকতে পারে। তবে হত্যাকাণ্ডের তারিখ, স্থান ও নিহতদের পরিচয় নিয়ে তথ্যসূত্রগুলোর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

জেল হত্যা দিবস কবে পালিত হয়?
প্রতি বছর ৩ নভেম্বর।

জেল হত্যায় কাদের হত্যা করা হয়?
সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান।

ঘটনাটি কোথায় ঘটে?
পুরান ঢাকার তৎকালীন কেন্দ্রীয় কারাগারে।

এই মামলার বিচার শেষ পর্যন্ত কীভাবে হয়েছে?
২০০৪ সালে বিচারিক আদালতের রায়, পরে হাইকোর্টের রায় এবং ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়েছে। বিস্তারিত উপরের টেবিলে দেওয়া আছে।

হালনাগাদ লগ

  • ৩ নভেম্বর ২০২৬,

তথ্যসূত্র

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

২১শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ