আন্তর্জাতিক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ইতিহাসের পাতা থেকে | বিশেষ ফিচার
ডেস্ক রিপোর্ট, পালস বাংলাদেশ
সর্বশেষ আপডেট: ২০ জুন ২০২৬
ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণে বাঙালি এবং বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ও সামরিক অবদান চিরকাল বিশ্বমঞ্চে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণক্ষেত্রে একজন অকুতোভয় নারীর বজ্রকণ্ঠ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর কূটনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ—সবখানেই জড়িয়ে আছে রোমাঞ্চকর সব ইতিহাস।
হিটলারের নাৎসি বাহিনীকে কাঁপিয়ে দেওয়া ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক নারী স্নাইপার

“ভদ্রলোকরা, আপনারা কি ভাবেন না যে, আমার পিঠের পিছনে আমার উপর ভর করে আপনারা অনেকক্ষণ ধরে লুকিয়ে আছেন?”
১৯৪২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে হাজার হাজার পুরুষের সামনে দাঁড়িয়ে এই বজ্রকণ্ঠের ঐতিহাসিক উক্তিটি করেছিলেন মাত্র ২৫ বছর বয়সী এক তরুণী। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ও সফল নারী স্নাইপার লেফটেন্যান্ট লুডমিলা পাভলিচেনকো (Lyudmila Pavlichenko)। যিনি একা হাতে ৩০৯ জন নাৎসি সেনাকে খতম করেছিলেন।

ক) নার্স নয়, স্নাইপার হওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রায় ২,০০০ নারীকে স্নাইপার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল, যাদের মধ্যে লুডমিলা ছিলেন সবচেয়ে সেরা। শুরুর দিকে সেনাবাহিনীতে তাঁকে নার্স হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন এবং একটি কঠিন অডিশন বা ট্রায়ালের মুখোমুখি হয়ে অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের নিখুঁত নিশানাভেদের দক্ষতা প্রমাণ করেন।
খ) মাত্র এক বছরে ৩০৯টি “কনফার্মд কিল”
স্নাইপার হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার পর ওডেসায় লড়াইকালীন প্রথম ৭৫ দিনের মধ্যেই লুডমিলা ১৮৭ জন শত্রুকে পরাস্ত করেন। মাত্র এক বছরের মধ্যে তাঁর নিশ্চিত হত্যার (Confirmed Kills) সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০৯ জনে, যার মধ্যে ৩৬ জন ছিলেন খোদ জার্মানদের তুখোড় স্নাইপার!
সামরিক পরিভাষায় “কনফার্মড কিল” কী?
যুদ্ধক্ষেত্রে একজন স্নাইপার কাউকে গুলি করলেই সেটি রেকর্ডে যোগ হয় না। একটি হত্যাকাণ্ড তখনই “কনফার্মড” বা নিশ্চিত হিসেবে গণ্য করা হয়, যখন কোনো স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ বা কোনো সামরিক অফিসার সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে প্রমাণ দেন। ফলে, সাক্ষী ছাড়া লুডমিলা আসলে আরও কত নাৎসি সেনা খতম করেছিলেন, তার প্রকৃত সংখ্যা হয়তো ৩০৯ এর চেয়েও অনেক বেশি ছিল।
গ) হিটলারের বাহিনীর ভয় এবং চকোলেটের লোভনীয় প্রস্তাব
লুডমিলার নিখুঁত নিশানার কারণে জার্মান নাৎসি বাহিনীর কাছে তিনি এক আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠেন। জার্মানরা তাঁকে নিজেদের দলে ভেড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওয়ান-টু-ওয়ান রেডিও ব্রডকাস্টের মাধ্যমে বিলাসবহুল ঘর-সংসার, উচ্চপদস্থ সামরিক পদ এবং প্রচুর পরিমাণে চকোলেটের অফার দিতে শুরু করে।
এই সমস্ত লোভনীয় প্রস্তাব যখন লুডমিলা একবাক্যে প্রত্যাখ্যান করেন, তখন ক্ষিপ্ত জার্মানরা রেডিওতে তাকে হুমকি দিয়ে বলে, তাকে বন্দি করতে পারলে “৩০৯ টুকরো” করা হবে। এই হুমকি শুনে লুডমিলা পরে হেসে বলেছিলেন, “বাহ! এমনকি ওরাও তাহলে আমার নিখুঁত স্কোরটা ভালোভাবে জানত!”
ঘ) হোয়াইট হাউসে প্রথম সোভিয়েত নাগরিক
যুদ্ধের একপর্যায়ে আহত হওয়ার পর লুডমিলাকে সম্মুখ যুদ্ধ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং তাকে সোভিয়েত ইউনিয়নের একজন বিশেষ দূত হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পাঠানো হয়। তিনি ইতিহাসে প্রথম সোভিয়েত নাগরিক হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ পান এবং তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ও ফার্স্ট লেডি এলিয়েনর রুজভেল্টের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন দেশের ঐতিহাসিক অবদান
১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার পর বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক বিশাল মেরুকরণ তৈরি হয়। একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়ক, সমাজতান্ত্রিক পরাশক্তি, সাহসী কূটনীতিবিদ এবং অকুতোভয় সাংবাদিকদের অবদান ছিল আকাশচুম্বী।
১. ভারত এবং ইন্দিরা গান্ধী: সর্বাত্মক কূটনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান ছিল সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও বহুমুখী। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে এবং পাকিস্তানি গণহত্যার চিত্র বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে প্রধানতম ভূমিকা পালন করেন:
- আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দৌড়ঝাঁপ: ২৫ মার্চ কালরাতের গণহত্যার পর, ২৭ মার্চ ভারতের লোকসভায় তিনি এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে ভাষণ দেন এবং ৩১ মার্চ মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে পাস করান। মে মাসে বেলগ্রেডের বিশ্বশান্তি কংগ্রেসে ইন্দিরা গান্ধীর বাণীতে বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানালে ৮০টি দেশের প্রতিনিধিরা তা সাদরে গ্রহণ করেন।
- ম্যারাথন বিশ্ব সফর: ২৪ অক্টোবর থেকে তিনি ১৯ দিনের এক ম্যারাথন বিশ্ব সফরে বের হন এবং ব্রাসেলস, ভিয়েনা, ব্রিটেন, আমেরিকা (প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সাথে ১২৫ মিনিটের বৈঠক), ফ্রান্স ও জার্মানিতে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করার আহ্বান জানান।
- সামরিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা: ভারতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় এক কোটি শরণার্থীর জন্য তিনি আশ্রয় ও খাদ্য নিশ্চিত করেন। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর লোকসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
- জে এফ আর জ্যাকব (লে. জেনারেল): একাত্তরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অব স্টাফ হিসেবে তিনি সীমান্ত এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প স্থাপন, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও রসদ জোগান দেওয়া এবং যৌথ সংস্কৃতির নকশা তৈরিতে অসামান্য অবদান রাখেন। ১৬ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণের পেছনেও তাঁর বিশাল ভূমিকা ছিল।
২. সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া): আন্তর্জাতিক ভেটো ও ভূরাজনৈতিক ঢাল

তৎকালীন পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া) বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক ঢাল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল:
- জাতিসংঘে ঐতিহাসিক ভেটো: বাংলাদেশের বিজয় যখন সুনিশ্চিত, তখন পাকিস্তানের মিত্র রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র ও চীন জাতিসংঘের security council বা নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তোলে। সোভিয়েত ইউনিয়ন সেই প্রস্তাবে পরপর ‘ভেটো’ (Veto) প্রদান করে মার্কিন-চীন চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেয়। রাশিয়া এই ভেটো না দিলে বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয় অর্জন বিলম্বিত বা নেতিবাচক খাতে মোড় নিতে পারত।
- মার্কিন সপ্তম নৌ-বহর প্রতিহত: বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌ-বহর পাঠানোর সিদ্ধান্তকে রাশিয়ার সক্রিয় নৌ-উপস্থিতি ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই থমকে যেতে হয়েছিল।
- পুনর্গঠনে রুশ অবদান: যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মাইন ও ধ্বংসাবশেষ অপসারণ করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ নিজেদের জীবনও উৎসর্গ করেন।
৩. আমেরিকা: সরকারের বিরোধিতা সত্ত্বেও মার্কিন নাগরিকদের অকৃত্রিম সমর্থন

১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রিহার্ড নিক্সনের রিপাবলিকান সরকার পাকিস্তানের পক্ষে থাকলেও, আমেরিকার সাধারণ জনগণ, সিনেটর, কবি ও শিল্পীরা বাংলাদেশের পক্ষে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন:
- সিনেটর এডওয়ার্ড ‘টেড’ কেনেডি: মার্কিন প্রশাসনের পাকিস্তান তোষণ নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি গণহত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানান। ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলো স্বচক্ষে পরিদর্শন করে মার্কিন সিনেটে ‘ক্রাইসিস ইন সাউথ এশিয়া’ শিরোনামে এক ঐতিহাসিক রিপোর্ট জমা দেন, যেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যার বিবরণ ছিল।
- কনসার্ট ফর বাংলাদেশ: ১ আগস্ট ১৯৭১ তারিখে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে ভারতের সেতারসম্রাট রবিশঙ্কর এবং বিটলস ব্যান্ডের জর্জ হ্যারিসন পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় এই চ্যারিটি কনসার্টের আয়োজন করেন। ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ, আল্লারাখা খাঁ, বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটনদের সুরের মূর্ছনায় unarmed বাঙালিদের ওপর চালানো পৈশাচিকতা বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয় এবং জর্জ হ্যারিসনের বিখ্যাত ‘বাংলাদেশ’ গানটি বিশ্বকে নাড়া দেয়।
- অ্যালেন গিন্সবার্গ: এই মার্কিন কবি বাংলাদেশের শরণার্থীদের হাহাকার নিয়ে লিখেছিলেন বিখ্যাত দীর্ঘ কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। যা পড়ে বিশ্বজুড়ে অজস্র মানুষের চোখ অশ্রুসজল হয়েছিল।
৪. যুক্তরাজ্য ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কলমযোদ্ধারা

লন্ডন ছিল বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক প্রচারণার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র, যেখানে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের অবদান ছিল অনন্য:
- অ্যান্থনি মাসকারেনহাস: এই পাকিস্তানি সাংবাদিক একাত্তরের এপ্রিলে বাংলাদেশে এসে গণহত্যার চাক্ষুষ তথ্য সংগ্রহ করেন এবং দেশ থেকে পালিয়ে লন্ডনের সানডে টাইমস পত্রিকায় ১৩ জুন তা প্রকাশ করেন। তাঁর লেখা ‘দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ’ বইটির মাধ্যমে বিশ্ববাসী প্রথম পাকিস্তানের আসল বর্বরতার কথা জানতে পারে।
- সায়মন ড্রিং: ডেইলি টেলিগ্রাফের এই তরুণ সাংবাদিক ২৫ মার্চের পর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে লুকিয়ে থেকে ঢাকার বুকে চালানো ধ্বংসযজ্ঞের প্রত্যক্ষ ছবি ও বিবরণ সংগ্রহ করেন। ব্যাংকক থেকে তাঁর প্রকাশিত প্রতিবেদন ‘ট্যাঙ্কস ক্রাশ রিভল্ট ইন পাকিস্তান’ পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
- সিডনি শ্যানберг: নিউইয়র্ক টাইমসের এই সাংবাদিকও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে ২৫ মার্চের হত্যাকাণ্ড সশরীরে দেখেন এবং যুদ্ধজুড়ে তাঁর পাঠানো অসংখ্য শরণার্থী-ভিত্তিক প্রতিবেদন পুরো বিশ্বকে নাড়া দেয়।
পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ
ইতিহাসের এই ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, বীরত্ব এবং সত্যের পক্ষে লড়াইয়ের কোনো ভৌগোলিক সীমানা থাকে না। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই মহান বন্ধুদের অকৃত্রিম সহায়তাই আজ আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জনের পথকে ত্বরান্বিত করেছিল।
আন্তর্জাতিক ইতিহাস, সমসাময়িক কূটনীতি এবং জাতীয় খবরের নিখুঁত ও নিরপেক্ষ আপডেট সবার আগে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের পালস বাংলাদেশ পোর্টালে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৭ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইতিহাস
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র (১৫শ খণ্ড), লে. কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ পিএসসির ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’, এবং সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাস ও সংবাদপত্র আর্কাইভস
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাস ছিল অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী, অস্থির এবং নাটকীয় পালাবদলের সময়। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে কয়েকটি সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে, যার চূড়ান্ত পরিণতি রূপ নেয় ৭ নভেম্বরের ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ বা ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি ও জনতার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধনে অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, যা বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক নতুন গতিপথে চালিত করে। এই ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল দিবসের নেপথ্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

১. পটভূমি: ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর খোন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ায় সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধে। এর জেরে ৩ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের তৎকালীন সিনিয়র অফিসার ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং ঢাকা ওয়ান বেঙ্গলের কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে একটি পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে।

খালেদ মোশাররফের এই অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তাঁর পদ থেকে পদচ্যুত করা হয় এবং ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে তাঁকে সম্পূর্ণ গৃহবন্দি (House Arrest) করে রাখা হয়। খন্দকার মোশতাককে সরিয়ে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ৬ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করেন।

২. নেপথ্যের অনুঘটক: জাসদ ও কর্নেল তাহেরের বিপ্লবের ডাক
মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের এই পাল্টা অভ্যুত্থানকে সেনাবাহিনীর সাধারণ জওয়ান বা সিপাহিদের একটি বড় অংশ ভারতের মদদপুষ্ট এবং মোশতাক চক্রের আরেকটি অংশের ক্ষমতার লড়াই হিসেবে চশমায় দেখছিল। এই সুযোগে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী দল ‘জাসদ’ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল)-এর সামরিক শাখা ‘গণবাহিনী’ এবং এর অন্যতম প্রধান নেতা লে. কর্নেল (অব.) আবু তাহের সেনানিবাসের সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে এক গোপন প্রচারণা চালান।
কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ সিপাহিদের বৈষম্য দূরীকরণ, ১২ দফা দাবি আদায় এবং ‘শ্রেণিহীন সামরিক ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ল্যান্স নায়েক ও সুবেদারদের সংগঠিত করে। ৭ নভেম্বর ভোররাতে এক গণ-অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল বন্দি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসা, কারণ জিয়াউর রহমান সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন।
৩. ৭ নভেম্বরের সেই ভয়াল রাত এবং সিপাহি-জনতার জাগরণ
৬ নভেম্বর মধ্যরাত পার হয়ে ৭ নভেম্বর ভোররাতে (আনুমানিক রাত ১টা থেকে ২টার মধ্যে) ঢাকা সেনানিবাসে সিপাহিদের বিদ্রোহ আনুষ্ঠানিকভাবে ফেটে পড়ে। ট্যাংকের গর্জন এবং শত শত রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণের মাধ্যমে সিপাহিরা ব্যারাকে ব্যারাকে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
- জিয়াউর রহমানের মুক্তি: সিপাহিদের একটি দল দ্রুত মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসভবনে যায় এবং পাহারারত সেন্ট্রিদের নিরস্ত্র করে তাঁকে অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত করে টু ফিল্ড আর্টিলারির সদর দপ্তরে নিয়ে আসে। মুক্ত হয়ে জিয়াউর রহমান সিপাহিদের শান্ত থাকার এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
- খালেদ মোশাররফের পতন ও মৃত্যু: সিপাহিদের এই ভয়াবহ বিদ্রোহের মুখে টিকতে না পেরে নবনিযুক্ত সেনাপ্রধান জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা এবং লে. কর্নেল এ টি এম হায়দার (যাঁরা সবাই বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন) শেরেবাংলা নগরের ১০ বেঙ্গলের সদর দপ্তরে আশ্রয় নেন। কিন্তু ৭ নভেম্বর সকালেই উত্তেজিত ও বিদ্রোহী সৈনিকদের হাতে এই তিন লিজেন্ডারি সামরিক কর্মকর্তা নির্মমভাবে নিহত হন।
- রাজপথে জনতার ঢল: সকাল হওয়ার সাথে সাথে সেনানিবাসের সিপাহিরা ট্রাকে করে, ট্যাংকের ওপর চড়ে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। তাদের মুখে স্লোগান ছিল—‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’, ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’। রাজপথের সাধারণ মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৈনিকদের সাথে যোগ দেয় এবং ফুলেল শুভেচ্ছা জানায়। সিপাহি ও জনতার এই অভূতপূর্ব সংহতির কারণেই দিনটিকে ইতিহাসে ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে অবিহিত করা হয়।
৪. রাজনৈতিক তাৎপর্য ও পরবর্তী ফলাফল
৭ নভেম্বরের এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দেয়:
- জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার কেন্দ্রে আগমন: এই বিপ্লবের পর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহাল থাকলেও, জিয়াউর রহমান উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (Chief Deputy Martial Law Administrator) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং কার্যত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।
- কর্নেল তাহেরের সাথে দূরত্ব: সিপাহিদের ১২ দফা দাবি এবং জাসদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী ধারার সাথে জিয়ার শাসনতান্ত্রিক ও শৃঙ্খলা রক্ষাকারী চিন্তাভাবনার দূরত্ব তৈরি হয়। যার ফলে পরবর্তীতে কর্নেল তাহেরসহ জাসদের অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সামরিক আদালতে কর্নেল তাহেরের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
ইতিহাসের পাতা সবসময় একমুখী নয়। ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেমন একটি পক্ষ ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ বা ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে অত্যন্ত গৌরব ও শ্রদ্ধার সাথে উদ্যাপন করে, ঠিক তেমনই আরেকটি পক্ষ এই দিনটিকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে স্মরণ করে, কারণ এই দিন সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বহু বীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও জওয়ানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। গুগলের ২০২৬ সালের নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক কনটেন্ট নির্দেশিকা অনুযায়ী, তরুণ প্রজন্মের জন্য কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত ছাড়া এই দিবসের সকল পক্ষের বাস্তব প্রেক্ষাপট ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সঠিকভাবে অনুধাবন করা জরুরি।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৬ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইসলাম ও জীবন
তথ্যসূত্র: আল-কোরআনের তাফসির (তাফসির ইবনে কাসির), সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিস এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত নবী-রাসূলদের জীবনী গ্রন্থ।
বর্তমান ২০২৬ সালের আধুনিক ও তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ যুগে মানুষ বাহ্যিক ও বস্তুগত দিক থেকে অনেক উন্নত হলেও, মানসিক প্রশান্তি, নৈতিকতা ও জীবনবোধের দিক থেকে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতি-ব্যবহার, পারস্পরিক দূরত্বের এই যুগে সঠিক জীবনদর্শনের অভাব স্পষ্ট। মানবজাতির হেদায়েত ও সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে যে নবী-রাসূলদের পাঠিয়েছেন, তাদের জীবন কেবল ইতিহাসের কিছু গল্প নয়; বরং তা কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য এক জীবন্ত ও কালজয়ী গাইডলাইন। এই বিশেষ সিরিজের ১ম পর্বে আমরা আলোচনা করব নবী-রাসূলদের অনন্য জীবন থেকে আজকের দিনে আমাদের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার মতো ৩টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
১. হযরত আইয়ুব (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা: চরম বিপদেও মানসিক শক্তি ও ধৈর্য (Patience)
আজকের যুগে সামান্য আর্থিক ক্ষতি, চাকরি হারানো কিংবা পারিবারিক বা শারীরিক অসুস্থতায় মানুষ দ্রুত হতাশ হয়ে পড়ে, এমনকি অনেকে আত্মহননের পথও বেছে নেয়। এই মানসিক সংকটে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় আদর্শ হলেন হযরত আইয়ুব (আ.)।
আল্লাহ তাআলা তাঁকে দীর্ঘ বছর ধরে কঠিন রোগ, সন্তানদের মৃত্যু এবং সমস্ত ধন-সম্পদ হারানোর মাধ্যমে পরীক্ষা করেছিলেন। কিন্তু এমন চরম সংকটেও তিনি আল্লাহর প্রতি বিন্দুমাত্র অভিযোগ করেননি, বরং চরম ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন।
- আজকের দিনের শিক্ষা: আধুনিক জীবনে বিষণ্ণতা (Depression) বা যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে ভেঙে না পড়ে ইতিবাচক থাকা এবং বিশ্বাস রাখা যে—কষ্টের পরেই স্বস্তি আসে। বিপদে অধৈর্য না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখাই হলো সফলতার মূল চাবি।
২. হযরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা: নৈতিক স্খলন ও প্রলোভন থেকে নিজেকে রক্ষা করা (Self-Control)
বর্তমান ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক মাধ্যমের উন্মুক্ততার কারণে তরুণ প্রজন্মের সামনে পর্নোগ্রাফি, অবৈধ সম্পর্ক এবং নৈতিক স্খলনের নানামুখী প্রলোভন প্রতিনিয়ত আসছে। নিজের চরিত্র ও নৈতিকতা ধরে রাখা আজকের দিনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
হযরত ইউসুফ (আ.) ছিলেন অপরূপ সুন্দর এবং যুবক। মিশরের আজিজের স্ত্রী যখন ঘরের সমস্ত দরজা বন্ধ করে উনাকে পাপের দিকে আহ্বান করেছিল, তখন তিনি সমস্ত প্রলোভন ও ক্ষমতার দাপটকে তুচ্ছ করে বলেছিলেন, “আমি আল্লাহর আশ্রয় চাচ্ছি।” পাপের চেয়ে তিনি কারাগারের বন্দিজীবনকে বেছে নিয়েছিলেন।

- আজকের দিনের শিক্ষা: চারপাশে যত বড় বা সহজ প্রলোভনই থাকুক না কেন, আল্লাহর ভয়কে অন্তরে জাগ্রত রেখে নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ (Self-Control) বজায় রাখা। ক্যারিয়ার বা জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে সাময়িক আনন্দের চেয়ে চিরস্থায়ী নৈতিকতা ও সততাকে প্রাধান্য দেওয়া।
৩. হযরত নূহ (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা: সামাজিক সমালোচনা উপেক্ষা করে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকা (Perseverance)
আজকের দিনে তরুণ বা উদ্যোক্তারা যখন নতুন বা ভালো কোনো কাজ করতে যায়, তখন সমাজের মানুষের সমালোচনা, ট্রল বা উপহাসের শিকার হয়ে অনেকেই মাঝপথে কাজ ছেড়ে দেয়। মানুষের কথা বা সামাজিক চাপের মুখে নিজের সৎ লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া খুবই সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হযরত নূহ (আ.) যখন আল্লাহর নির্দেশে মরুভূমির বুকে বিশাল নৌকা তৈরি করছিলেন, তখন সমকালীন সমাজের মানুষ উনাকে দেখে চরম উপহাস করত, পাগল বলত। কিন্তু তিনি মানুষের কোনো উপহাস বা ট্রলের দিকে কান না দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই নৌকাই বিশ্বাসীদের রক্ষা করেছিল।
- আজকের দিনের শিক্ষা: আপনি যদি নিশ্চিত হন যে আপনার কাজটি সৎ, সঠিক এবং মানবকল্যাণকর, তবে সমাজ বা সোশ্যাল মিডিয়ার মানুষ কী বলল বা কী ট্রল করল—তাতে কান না দিয়ে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকা। দৃঢ় সংকল্প এবং কঠোর পরিশ্রমই শেষ পর্যন্ত সত্যকে জয়ী করে।
নবী-রাসূলদের এই চমৎকার ঐতিহাসিক শিক্ষাগুলো কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং আমাদের প্রতিদিনের আচরণ, কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক জীবনে চর্চা করা উচিত। তবেই আমরা এই আধুনিক ও জটিল পৃথিবীতে একটি শান্তিপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গড়ে তুলতে সক্ষম হব।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৪ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: জাতীয়
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ গণপরিষদের কার্যবিবরণী, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের সংবিধানের মূল প্রস্তাবনা।
আজ ৪ নভেম্বর, ঐতিহাসিক ‘বাংলাদেশ সংবিধান দিবস’। ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ সময় এই দিনটি উপেক্ষিত থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭২ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন তথা সংবিধান গণপরিষদে গৃহীত হয়েছিল। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ১১ মাসের মাথায় কীভাবে একটি বিশ্বমানের ও যুগোপযোগী সংবিধান লাভ করেছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। নিচে বাংলাদেশের সংবিধান রচনা ও গ্রহণের সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

১. পটভূমি ও গণপরিষদ আদেশ জারি
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করার পর একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নিজস্ব আইনি কাঠামোর প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন। এর পরদিনই অর্থাৎ ১১ জানুয়ারি তিনি ‘অস্থায়ী সংবিধান আদেশ’ জারি করেন। এর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তন করা হয়।
পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ’ জারি করা হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে এই গণপরিষদ গঠিত হয়, যার মূল দায়িত্ব ছিল দেশের জন্য একটি স্থায়ী সংবিধান প্রণয়ন করা। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়।
২. খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন
গণপরিষদের দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘সংবিধান প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটিতে একমাত্র নারী সদস্য ছিলেন বেগম রাজিয়া বানু। এছাড়া তৎকালীন বিরোধী দলের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।
কমিটি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাদের কাজ শুরু করে। বিভিন্ন দেশের সংবিধান পর্যালোচনা এবং দেশের আপামর জনসাধারণের মতামত সংগ্রহের জন্য তারা ব্যাপক উদ্যোগ নেন। সর্বস্তরের জনগণের কাছ থেকে মোট ৯৮টি লিখিত প্রস্তাব সংগ্রহ করা হয়েছিল। ভারত ও যুক্তরাজ্যের সংবিধানকে মূল ভিত্তি ধরে খসড়া তৈরির কাজ এগিয়ে চলে।
৩. খসড়া উত্থাপন ও বিতর্ক
দীর্ঘ কঠোর পরিশ্রমের পর ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ড. কামাল হোসেন খসড়া সংবিধান বিল আকারে উত্থাপন করেন। ১৯ অক্টোবর থেকে এর ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয়।
সংবিধানের প্রতিটি অনুচ্ছেদ ও ধারা নিয়ে গণপরিষদে ব্যাপক বিতর্ক ও আলোচনা হয়। গণপরিষদের সদস্যরা বিভিন্ন সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। মোট ৪১টি অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনার পর সংবিধানের প্রতিটি বিষয়কে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়।
৪. সংবিধান গ্রহণ ও কার্যকর
অবশেষে ৪ নভেম্বর, ১৯৭২ সালে গণপরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে ‘বাংলাদেশের সংবিধান’ গৃহীত হয়। সংবিধান গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, “এই সংবিধান শহীদের রক্তে লিখিত, এ সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।”
এর ঠিক দেড় মাস পর, অর্থাৎ বিজয়ের প্রথম বার্ষিকী—১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭২ থেকে এই সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়। সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপিটি ছিল হাতে লেখা, যা শিল্পী হাশেম খানের নকশায় এবং প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফার আবদুর রউফের হাতের লেখায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। এতে স্বাক্ষর করেছিলেন গণপরিষদের সদস্যবৃন্দ।
একটি দেশের সংবিধান কেবল কিছু আইনের সমষ্টি নয়, এটি রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের সংবিধানের মূল স্তম্ভ ছিল চারটি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। সময়ের আবর্তে এই সংবিধানে বহু পরিবর্তন ও সংশোধনী আনা হলেও, ৪ নভেম্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সবসময়ই অনস্বীকার্য। তরুণ প্রজন্মের জন্য নিজেদের অধিকার ও রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা বুঝতে সংবিধান রচনার এই ইতিহাস জানা অত্যন্ত জরুরি।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



