অপরাধ

বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও নাগরিকদের দায়বদ্ধতা: ক্ষমতার মোহ বনাম জনগণের শক্তি
বাংলাদেশের প্রশাসনিক বাস্তবতা

নিউজ ডেস্ক

April 19, 2026

শেয়ার করুন

বিশ্লেষণ ও ভাষ্য: BDS Bulbul Ahmed

তারিখ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে একটি কথা ব্যঙ্গাত্মক শোনালেও তা কঠোর বাস্তব—এ দেশে ‘চোরের’ কোনো সংকট নেই, সংকটে আছে কেবল ফাঁকা চেয়ারের। একজনের প্রস্থানে আরেকজনের আগমন ঘটে ঠিকই, কিন্তু সিস্টেমের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে থাকা সেই ‘উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া’ দুর্নীতির সংস্কৃতি যেন অবিনশ্বর। ক্ষমতা এখানে দায়িত্বের চেয়ে অনেক সময় ‘ব্যক্তিগত সম্পদ’ হিসেবেই বেশি বিবেচিত হয়।

১. চেয়ারের উত্তরাধিকার ও দুর্নীতির চক্র

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে একটি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা হলো প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ব্যক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, যখন কোনো দেশে জবাবদিহিতার ঘাটতি থাকে, তখন সরকারি চেয়ারগুলো জনসেবার বদলে ক্ষমতার দাপট দেখানোর হাতিয়ারে পরিণত হয়। ঘুষ আর ক্ষমতার দাপটে পিষ্ট হয় সেই সাধারণ মানুষ, যাদের হাড়ভাঙা খাটুনি আর ঘামে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রয়েছে।

উদ্ধৃতি: “অন্যায় যখন নিয়মে পরিণত হয়, তখন প্রতিরোধই হয়ে দাঁড়ায় কর্তব্য।” (থোমাস জেফারসন)। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই কথাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

২. দেশপ্রেমের মুখোশ ও বিবেকের দহন

সবচেয়ে অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায় যখন লুণ্ঠনকারী গোষ্ঠীগুলোই জনসম্মুখে দেশপ্রেমের সবচেয়ে বড় বড় ভাষণ দেয়। জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলেও তাদের কর্মকাণ্ডে জাতীয় স্বার্থের প্রতিফলন থাকে না। নৈতিকতা ও বিবেককে বিসর্জন দিয়ে কেবল ব্যক্তিগত লাভের আশায় তারা সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করে চলেছে।

৩. নাগরিক অধিকার: দেশ কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়

বাংলাদেশ নামক এই রাষ্ট্রটি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি এ দেশের কৃষক, শ্রমিক, প্রবাসী এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিকের যৌথ মালিকানার ফসল। ডেমোক্রেটিক পিস থিওরি (Democratic Peace Theory) এবং নাগরিক সচেতনতা তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি রাষ্ট্র তখনই টেকসই উন্নয়ন অর্জন করে যখন তার নাগরিকরা বুঝতে পারে যে রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তির উৎস তারা স্বয়ং।

. ভবিষ্যৎ পথরেখা: অভিযোগ থেকে সচেতনতায়

কেবল অভিযোগ বা হতাশা প্রকাশ করে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সচেতনতা ও সাহসের মেলবন্ধন। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য তিনটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি:

  • সিস্টেমের সংস্কার: কেবল নেতা বদল নয়, বরং চুরির সুযোগ বন্ধ করার জন্য ডিজিটাল স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
  • নাগরিক সচেতনতা: সাধারণ মানুষকে তার নিজের সাংবিধানিক ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে হবে।
  • প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ: অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং সরকারি প্রতিটি টাকার হিসাব দাবি করা।

বিডিএস পর্যবেক্ষণ (Editorial Insight):

ক্ষমতার খেলা সেদিনই কঠিন হয়ে পড়বে, যেদিন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে শাসকরা তাদের মালিক নয়, বরং সেবক। সচেতনতা যেদিন ভয়ে পরিণত হবে না এবং সাহস যেদিন সত্যের পথে পরিচালিত হবে, সেদিনই নতুন বাংলাদেশের পথচলা শুরু হবে।


তথ্যসূত্র (References):

১. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান: অনুচ্ছেদ ৭ (জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস)।

২. আন্তর্জাতিক স্বচ্ছতা সূচক (Transparency International): দক্ষিণ এশিয়ার প্রশাসনিক দুর্নীতি ও জবাবদিহিতা বিষয়ক প্রতিবেদন।

৩. ইমানুয়েল কান্টের ডেমোক্রেটিক পিস থিওরি: গণতান্ত্রিক সমাজ ও নাগরিক দায়বদ্ধতা।

৪. বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ প্রতিবেদন: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সাধারণ মানুষের অবদান ও সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস

নিউজ ডেস্ক

November 7, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৭ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইতিহাস
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র (১৫শ খণ্ড), লে. কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ পিএসসির ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’, এবং সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাস ও সংবাদপত্র আর্কাইভস 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাস ছিল অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী, অস্থির এবং নাটকীয় পালাবদলের সময়। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে কয়েকটি সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে, যার চূড়ান্ত পরিণতি রূপ নেয় ৭ নভেম্বরের ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ বা ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি ও জনতার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধনে অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, যা বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক নতুন গতিপথে চালিত করে। এই ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল দিবসের নেপথ্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো। 

১. পটভূমি: ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর খোন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ায় সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধে। এর জেরে ৩ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের তৎকালীন সিনিয়র অফিসার ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং ঢাকা ওয়ান বেঙ্গলের কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে একটি পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। 

খালেদ মোশাররফের এই অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তাঁর পদ থেকে পদচ্যুত করা হয় এবং ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে তাঁকে সম্পূর্ণ গৃহবন্দি (House Arrest) করে রাখা হয়। খন্দকার মোশতাককে সরিয়ে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ৬ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করেন। 

২. নেপথ্যের অনুঘটক: জাসদ ও কর্নেল তাহেরের বিপ্লবের ডাক
মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের এই পাল্টা অভ্যুত্থানকে সেনাবাহিনীর সাধারণ জওয়ান বা সিপাহিদের একটি বড় অংশ ভারতের মদদপুষ্ট এবং মোশতাক চক্রের আরেকটি অংশের ক্ষমতার লড়াই হিসেবে চশমায় দেখছিল। এই সুযোগে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী দল ‘জাসদ’ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল)-এর সামরিক শাখা ‘গণবাহিনী’ এবং এর অন্যতম প্রধান নেতা লে. কর্নেল (অব.) আবু তাহের সেনানিবাসের সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে এক গোপন প্রচারণা চালান। 

কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ সিপাহিদের বৈষম্য দূরীকরণ, ১২ দফা দাবি আদায় এবং ‘শ্রেণিহীন সামরিক ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ল্যান্স নায়েক ও সুবেদারদের সংগঠিত করে। ৭ নভেম্বর ভোররাতে এক গণ-অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল বন্দি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসা, কারণ জিয়াউর রহমান সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। 

৩. ৭ নভেম্বরের সেই ভয়াল রাত এবং সিপাহি-জনতার জাগরণ
৬ নভেম্বর মধ্যরাত পার হয়ে ৭ নভেম্বর ভোররাতে (আনুমানিক রাত ১টা থেকে ২টার মধ্যে) ঢাকা সেনানিবাসে সিপাহিদের বিদ্রোহ আনুষ্ঠানিকভাবে ফেটে পড়ে। ট্যাংকের গর্জন এবং শত শত রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণের মাধ্যমে সিপাহিরা ব্যারাকে ব্যারাকে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। 

  • জিয়াউর রহমানের মুক্তি: সিপাহিদের একটি দল দ্রুত মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসভবনে যায় এবং পাহারারত সেন্ট্রিদের নিরস্ত্র করে তাঁকে অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত করে টু ফিল্ড আর্টিলারির সদর দপ্তরে নিয়ে আসে। মুক্ত হয়ে জিয়াউর রহমান সিপাহিদের শান্ত থাকার এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান। 
  • খালেদ মোশাররফের পতন ও মৃত্যু: সিপাহিদের এই ভয়াবহ বিদ্রোহের মুখে টিকতে না পেরে নবনিযুক্ত সেনাপ্রধান জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা এবং লে. কর্নেল এ টি এম হায়দার (যাঁরা সবাই বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন) শেরেবাংলা নগরের ১০ বেঙ্গলের সদর দপ্তরে আশ্রয় নেন। কিন্তু ৭ নভেম্বর সকালেই উত্তেজিত ও বিদ্রোহী সৈনিকদের হাতে এই তিন লিজেন্ডারি সামরিক কর্মকর্তা নির্মমভাবে নিহত হন। 
  • রাজপথে জনতার ঢল: সকাল হওয়ার সাথে সাথে সেনানিবাসের সিপাহিরা ট্রাকে করে, ট্যাংকের ওপর চড়ে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। তাদের মুখে স্লোগান ছিল—‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’, ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’। রাজপথের সাধারণ মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৈনিকদের সাথে যোগ দেয় এবং ফুলেল শুভেচ্ছা জানায়। সিপাহি ও জনতার এই অভূতপূর্ব সংহতির কারণেই দিনটিকে ইতিহাসে ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে অবিহিত করা হয়। 

৪. রাজনৈতিক তাৎপর্য ও পরবর্তী ফলাফল
৭ নভেম্বরের এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দেয়: 

  • জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার কেন্দ্রে আগমন: এই বিপ্লবের পর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহাল থাকলেও, জিয়াউর রহমান উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (Chief Deputy Martial Law Administrator) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং কার্যত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। 
  • কর্নেল তাহেরের সাথে দূরত্ব: সিপাহিদের ১২ দফা দাবি এবং জাসদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী ধারার সাথে জিয়ার শাসনতান্ত্রিক ও শৃঙ্খলা রক্ষাকারী চিন্তাভাবনার দূরত্ব তৈরি হয়। যার ফলে পরবর্তীতে কর্নেল তাহেরসহ জাসদের অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সামরিক আদালতে কর্নেল তাহেরের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। 


ইতিহাসের পাতা সবসময় একমুখী নয়। ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেমন একটি পক্ষ ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ বা ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে অত্যন্ত গৌরব ও শ্রদ্ধার সাথে উদ্‌যাপন করে, ঠিক তেমনই আরেকটি পক্ষ এই দিনটিকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে স্মরণ করে, কারণ এই দিন সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বহু বীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও জওয়ানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। গুগলের ২০২৬ সালের নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক কনটেন্ট নির্দেশিকা অনুযায়ী, তরুণ প্রজন্মের জন্য কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত ছাড়া এই দিবসের সকল পক্ষের বাস্তব প্রেক্ষাপট ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সঠিকভাবে অনুধাবন করা জরুরি। 

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

বিকাশ

নিউজ ডেস্ক

November 6, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৬ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ডিজিটাল ও সাইবার জগৎ
তথ্যসূত্র: বিকাশ (bKash) সিকিউরিটি গাইডলাইন, বাংলাদেশ ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) এবং সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন (ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ) 

ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার সাথে সাথে অনলাইন শপিং এবং মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ) আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এই সুবিধার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অভিনব সব সাইবার জালিয়াতি ও প্রতারণা। প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষ বিভিন্ন লোভনীয় অফার বা চতুর ফিশিংয়ের ফাঁদে পড়ে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ও বিকাশ অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন। গুগলের ২০২৬ সালের সর্বশেষ ইউজার সেফটি ও সিকিউরিটি গাইডলাইন অনুযায়ী, অনলাইন শপিং ও বিকাশ ব্যবহার করার সময় জালিয়াতি চক্রকে ধরার ৭টি পাকা ও প্রমাণিত উপায় নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো: 

১. অস্বাভাবিক মূল্যছাড় এবং “অবাস্তব” অফার (Too Good to be True)
প্রতারক চক্রের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো লোভ। বাজারে যে প্রোডাক্টটির আসল দাম ৫,০০০ টাকা, কোনো পেজ বা ওয়েবসাইটে যদি সেটি মাত্র ১,৫০০ টাকায় ‘অফারের’ নামে বিক্রি করার বিজ্ঞাপন দেখেন, তবে শুরুতেই সতর্ক হন। আইফোন, প্রিমিয়াম গ্যাজেট বা ব্র্যন্ডেড পোশাকের ক্ষেত্রে এই ধরনের অবাস্তব ছাড় মূলত ক্রেতাদের ফাঁদে ফেলার প্রথম ধাপ। 

২. শুধু ‘অ্যাডভান্স ফুল পেমেন্ট’ বা অগ্রিম টাকা নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া
বিশ্বস্ত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো সবসময় ক্যাশ অন ডেলিভারি (COD) বা কন্ডিশনাল ডেলিভারির সুবিধা দেয়। কিন্তু কোনো নতুন বা স্বল্প পরিচিত পেজ যদি পণ্য ডেলিভারি দেওয়ার আগেই বিকাশের মাধ্যমে সম্পূর্ণ টাকা বা অতিরিক্ত ডেলিভারি চার্জ অগ্রিম পরিশোধ করার জন্য অনবরত চাপ দিতে থাকে, তবে বুঝতে হবে এখানে বড় ধরনের গড়মিল রয়েছে। নির্ভরযোগ্য কোনো প্রতিষ্ঠান কাস্টমারকে পেমেন্টের জন্য বারবার তাগাদা দেয় না। 

৩. ভুয়া বিকাশ কল এবং পিন/ওটিপি (PIN/OTP) চাওয়া
বিকাশ প্রতারণার অন্যতম সাধারণ পদ্ধতি হলো গ্রাহককে ফোন করে বলা যে, “আমি বিকাশ অফিস থেকে বলছি, আপনার অ্যাকাউন্টটি ব্লক হয়ে গেছে” অথবা “ভুল করে আপনার অ্যাকাউন্টে টাকা চলে গেছে, ওটিপি (OTP) কোডটি বলুন।” মনে রাখবেন, বিকাশের কোনো কর্মকর্তা বা কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধি কখনোই আপনার ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (OTP) কিংবা ৪ বা ৫ ডিজিটের গোপন পিন (PIN) নম্বর জানতে চাইবে না। কেউ এটি চাইলেই নিশ্চিতভাবে সে একজন প্রতারক। 

৪. ভুয়া এসএমএস (Fake SMS) ও স্পুফিং লিংকের ব্যবহার
অনেক সময় প্রতারকেরা হুবহু বিকাশের মেসেজ ফরম্যাট নকল করে আপনার ফোনে বার্তা পাঠায়, যাতে লেখা থাকে “You have received TK. 5,000″। এই মেসেজগুলো কিন্তু আপনার আসল বিকাশ অ্যাপের ব্যালেন্স বাড়ায় না। এছাড়া ‘বিকাশ বোনাস’ বা ‘সরকারি অনুদান’ পাওয়ার লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন ফিশিং লিংক পাঠানো হয়। কোনো লিংকে ক্লিক করে আপনার বিকাশ নম্বর এবং পিন সাবমিট করার আগে অবশ্যই ওয়েবসাইটের ইউআরএল (URL) চেক করুন। বিকাশের আসল ওয়েবসাইট লিংক সবসময় https://www.bkash.com/ দিয়ে শুরু হয়। 

৫. ফেসবুক পেজের লাইক, কমেন্ট ও রিভিউ সেকশন হাইড বা অফ থাকা
অনলাইন শপিং পেজটি আসল নাকি নকল তা চেনার একটি সহজ উপায় হলো তাদের রিভিউ সেকশন। প্রতারক চক্রের পেজগুলোতে সাধারণত কাস্টমার রিভিউ অপশন বন্ধ থাকে এবং পোস্টের কমেন্ট সেকশন হাইড (Hide) বা লিমিটেড করা থাকে, যাতে প্রতারিত হওয়া অন্য ভুক্তভোগীরা সেখানে নেতিবাচক মন্তব্য করতে না পারেন। এছাড়া পেজের ‘Page Transparency’ অপশনে গিয়ে পেজটি কবে তৈরি হয়েছে এবং এর আগে কতবার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে তা দেখে এর নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা যায়। 

৬. ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে (Personal Number) ‘সেন্ড মানি’ করার তাগিদ
যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রফেশনাল অনলাইন শপের নিজস্ব ‘বিকাশ মার্চেন্ট’ (Merchant Account) অ্যাকাউন্ট থাকে, যেখানে গ্রাহক ‘মেক পেমেন্ট’ অপশন ব্যবহার করে কেনাকাটা করেন। কিন্তু বিক্রেতা যদি কোনো মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট না দেখিয়ে আপনাকে বারবার পার্সোনাল নম্বরে ‘সেন্ড মানি’ বা ‘ক্যাশ ইন’ করতে বলে, তবে সাবধান হোন। পার্সোনাল নম্বরে টাকা পাঠালে পরবর্তীতে প্রতারণার শিকার হলেও সেই টাকা ট্র্যাক করা বা রিফান্ড পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। 

৭. লাইভ চ্যাটে ফেসবুক আইডির সত্যতা এবং ট্র্যাকিং আইডি না দেওয়া
পণ্য অর্ডার করার পর যদি তারা কোনো কুরিয়ার সার্ভিসের (যেমন- সুন্দরবন, স্টিডফাস্ট, পাথao) মেমো বা ট্র্যাকিং আইডি দিতে টালবাহানা করে অথবা বারবার কুরিয়ারে বুকিং দেওয়ার নাম করে অতিরিক্ত ‘প্রসেসিং ফি’ দাবি করে, তবে ধরে নেবেন আপনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। জালিয়াতি চক্র সাধারণত টাকা পাওয়ার পরপরই গ্রাহকের ফেসবুক আইডি বা ফোন নম্বর ব্লক করে দেয়। 

প্রতারিত হলে তাৎক্ষণিক করণীয় ও আইনি প্রতিকার:
১. বিকাশ হেল্পলাইন ১৬২৪৭: যদি ভুলবশত কোনো প্রতারককে টাকা পাঠিয়ে দেন বা ওটিপি শেয়ার করে ফেলেন, তবে এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে সরাসরি বিকাশের হটলাইন নম্বর ১৬২৪৭-এ কল করে আপনার অ্যাকাউন্টটি সাময়িকভাবে লক করুন এবং যে নম্বরে টাকা গেছে সেটি রিপোর্ট করুন।
২. জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (DNCRP): অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারিত হলে মেমো, চ্যাটের স্ক্রিনশট এবং পেমেন্ট প্রুফসহ ভোক্তা অধিকারে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেন।
৩. সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন: বিকাশ বা অনলাইন শপিং জালিয়াতির শিকার হলে নিকটস্থ থানায় জিডি (GD) করুন এবং ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিটের ফেসবুক পেজে বা সরাসরি হ্যালো সিটি (Hello CT) অ্যাপের মাধ্যমে অভিযোগ জানান। ডিজিটাল সিকিউরিটি ও সাইবার ক্রাইম টিম এই ধরনের অপরাধীদের আইপি ও লোকেশন ট্র্যাক করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে সক্ষম। 

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

সংবিধান দিবস

নিউজ ডেস্ক

November 4, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৪ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: জাতীয়
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ গণপরিষদের কার্যবিবরণী, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের সংবিধানের মূল প্রস্তাবনা। 

আজ ৪ নভেম্বর, ঐতিহাসিক ‘বাংলাদেশ সংবিধান দিবস’। ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ সময় এই দিনটি উপেক্ষিত থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭২ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন তথা সংবিধান গণপরিষদে গৃহীত হয়েছিল। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ১১ মাসের মাথায় কীভাবে একটি বিশ্বমানের ও যুগোপযোগী সংবিধান লাভ করেছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। নিচে বাংলাদেশের সংবিধান রচনা ও গ্রহণের সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বিস্তারিত তুলে ধরা হলো। 

১. পটভূমি ও গণপরিষদ আদেশ জারি
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করার পর একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নিজস্ব আইনি কাঠামোর প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন। এর পরদিনই অর্থাৎ ১১ জানুয়ারি তিনি ‘অস্থায়ী সংবিধান আদেশ’ জারি করেন। এর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তন করা হয়। 

পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ’ জারি করা হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে এই গণপরিষদ গঠিত হয়, যার মূল দায়িত্ব ছিল দেশের জন্য একটি স্থায়ী সংবিধান প্রণয়ন করা। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। 

২. খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন
গণপরিষদের দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘সংবিধান প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটিতে একমাত্র নারী সদস্য ছিলেন বেগম রাজিয়া বানু। এছাড়া তৎকালীন বিরোধী দলের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। 

কমিটি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাদের কাজ শুরু করে। বিভিন্ন দেশের সংবিধান পর্যালোচনা এবং দেশের আপামর জনসাধারণের মতামত সংগ্রহের জন্য তারা ব্যাপক উদ্যোগ নেন। সর্বস্তরের জনগণের কাছ থেকে মোট ৯৮টি লিখিত প্রস্তাব সংগ্রহ করা হয়েছিল। ভারত ও যুক্তরাজ্যের সংবিধানকে মূল ভিত্তি ধরে খসড়া তৈরির কাজ এগিয়ে চলে। 

৩. খসড়া উত্থাপন ও বিতর্ক
দীর্ঘ কঠোর পরিশ্রমের পর ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ড. কামাল হোসেন খসড়া সংবিধান বিল আকারে উত্থাপন করেন। ১৯ অক্টোবর থেকে এর ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয়। 

সংবিধানের প্রতিটি অনুচ্ছেদ ও ধারা নিয়ে গণপরিষদে ব্যাপক বিতর্ক ও আলোচনা হয়। গণপরিষদের সদস্যরা বিভিন্ন সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। মোট ৪১টি অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনার পর সংবিধানের প্রতিটি বিষয়কে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়। 

৪. সংবিধান গ্রহণ ও কার্যকর
অবশেষে ৪ নভেম্বর, ১৯৭২ সালে গণপরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে ‘বাংলাদেশের সংবিধান’ গৃহীত হয়। সংবিধান গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, “এই সংবিধান শহীদের রক্তে লিখিত, এ সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।” 

এর ঠিক দেড় মাস পর, অর্থাৎ বিজয়ের প্রথম বার্ষিকী—১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭২ থেকে এই সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়। সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপিটি ছিল হাতে লেখা, যা শিল্পী হাশেম খানের নকশায় এবং প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফার আবদুর রউফের হাতের লেখায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। এতে স্বাক্ষর করেছিলেন গণপরিষদের সদস্যবৃন্দ। 


একটি দেশের সংবিধান কেবল কিছু আইনের সমষ্টি নয়, এটি রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের সংবিধানের মূল স্তম্ভ ছিল চারটি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। সময়ের আবর্তে এই সংবিধানে বহু পরিবর্তন ও সংশোধনী আনা হলেও, ৪ নভেম্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সবসময়ই অনস্বীকার্য। তরুণ প্রজন্মের জন্য নিজেদের অধিকার ও রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা বুঝতে সংবিধান রচনার এই ইতিহাস জানা অত্যন্ত জরুরি। 

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

২৩শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ