আন্তর্জাতিক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) হলো ইতিহাসের এক ভয়াবহতম সংঘাত। যদিও এর মূল কারণ ছিল দীর্ঘদিনের ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যে চাপা উত্তেজনা এবং জোটের রাজনীতি, তবে একটিমাত্র ঘটনা এই মহাযুদ্ধের সূত্রপাত করেছিল।
১. যুদ্ধ শুরুর তাৎক্ষণিক কারণ: সারায়েভো হত্যাকাণ্ড (The Spark)
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পেছনে মূল এবং তাৎক্ষণিক কারণটি ছিল অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রান্সিস ফার্ডিনান্দ এবং তাঁর স্ত্রীর হত্যাকাণ্ড।
- ঘটনা: ১৯১৪ সালের জুনে ফ্রান্সিস ফার্ডিনান্দ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় সামরিক বাহিনী পরিদর্শনে গেলে, গ্যাভ্রিলো প্রিন্সিপ নামের একজন বসনীয় যুবক তাদের গুলি করে হত্যা করে।
- ঘাতকের উদ্দেশ্য: গ্যাভ্রিলো প্রিন্সিপ ছিল ইয়াং বসনিয়া নামক একটি জাতীয়তাবাদী সংগঠনের সদস্য। তারা বিশ্বাস করত যে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা অঞ্চলটি অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের নয়, বরং এটি সার্বিয়ার সাথে একীভূত হয়ে যুগোস্লাভিয়া গঠন করবে। প্রিন্সিপের এই হত্যাকাণ্ড ছিল তাদের জাতীয়তাবাদী উদ্দেশ্যের বহিঃপ্রকাশ।
- অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির প্রতিক্রিয়া: অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়াকে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করে এবং তাদের ভূখণ্ডের ভেতরে ঢুকে তদন্ত, ধরপাকড় ও বিচার করার সুযোগ দেওয়ার জন্য ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেয়। সার্বিয়া এই দাবি মানতে রাজি না হওয়ায়, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা করে।
২. শক্তিজোটের রাজনীতি ও যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া
সারায়েভো হত্যাকাণ্ড দ্রুত একটি মহাযুদ্ধে পরিণত হয়, কারণ ইউরোপের প্রধান শক্তিগুলো পূর্ব-নির্ধারিত সামরিক জোটে বিভক্ত ছিল।
| জোটের নাম | প্রধান সদস্য রাষ্ট্র | ভূমিকা |
| ট্রিপল আঁতাত (Triple Entente) | ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া (এবং পরে ইতালি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ মিত্রশক্তি) | এটি ছিল মূলত জার্মানিকে ঘিরে ফেলার একটি বন্ধুত্বপূর্ণ জোট। |
| কেন্দ্রীয় শক্তি (Central Powers) | জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, অটোমান সাম্রাজ্য, বুলগেরিয়া | প্রধানত জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির মধ্যেকার সামরিক চুক্তি। |
কীভাবে যুদ্ধ ইউরোপে ছড়াল:
- জার্মানির সমর্থন: অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির বন্ধু হিসেবে জার্মানি একটি পূর্ব চুক্তি অনুসারে তাদের সমর্থন করে। জার্মান কাইজার দ্বিতীয় উইলহেম অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমর্থন (সোশাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির উত্থান মোকাবিলা) টানার জন্যও যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী ছিলেন।
- রাশিয়ার হস্তক্ষেপ:রাশিয়া অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে সার্বিয়ার পক্ষে যোগ দেয়। এর কারণ ছিল:
- জাতিগত সম্পর্ক: দুই দেশের বেশিরভাগ মানুষ একই স্লাভিক জাতিগোষ্ঠীর।
- ভূ-রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা: রাশিয়া কৃষ্ণ সাগর থেকে ভূমধ্যসাগরে যাওয়ার জলপথ (টার্কিক স্ট্রিট) নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল।
- ট্রিপল আঁতাতের যোগদান: রাশিয়া যুদ্ধে যোগ দিলে পূর্বের জোট অনুযায়ী ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যও রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধে লিপ্ত হয়।
- ইতালির অবস্থান পরিবর্তন: শুরুতে ট্রিপল অ্যালায়েন্সের সদস্য হলেও, ইতালি ১৯১৫ সালে লন্ডনের গোপন চুক্তিতে স্বাক্ষর করে এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলির লোভনীয় নিয়ন্ত্রণের শর্তে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়ার পক্ষে যোগ দেয়।
- নিরপেক্ষ বেলজিয়াম আক্রমণ: জার্মানি ফ্রান্স আক্রমণ করার জন্য নিরপেক্ষ বেলজিয়ামকে ব্যবহার করলে যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে প্রবেশ করে।
৩. আন্তর্জাতিক সমর্থন ও বৈশ্বিক আকার
যুদ্ধ কেবল ইউরোপেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বিভিন্ন দেশের নিজস্ব স্বার্থে তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে:
- অটোমান সাম্রাজ্য: ১৯১৪ সালের ২ আগস্ট জার্মানির সাথে গোপন চুক্তি স্বাক্ষর করে কেন্দ্রীয় শক্তিতে যোগ দেয়।
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসনের অধীনে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত নিরপেক্ষ থাকলেও, পরে মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধে প্রবেশ করে। যুদ্ধের পর আমেরিকা শিল্প, অর্থনীতি ও বাণিজ্যে বিশ্বনেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়।
- পর্তুগাল ও জাপান: পর্তুগাল ব্রিটেনকে এবং জাপান জার্মান নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে মিত্রবাহিনীকে সহায়তা করে, চীনের জার্মান নিয়ন্ত্রিত ভূমি পাওয়ার আশায়।
- চীন: চীন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী জাপানের বিরুদ্ধে শক্তি অর্জন করতে এবং যুদ্ধোত্তর দরকষাকষিতে স্থান পাকা করতে চেয়েছিল।
- অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড (ANZAC): তারা ব্রিটিশদের পক্ষে লড়াই করে। বেশিরভাগ অস্ট্রেলিয়ান বিশ্বাস করত যে যুদ্ধে অংশগ্রহণ তাদের জাতিকে একটি নতুন জাতি হিসেবে ‘প্রমাণ’ করবে।
- ভারতীয় সৈন্য: ব্রিটিশদের হয়ে লড়াইয়ের জন্য ১৩ লক্ষেরও বেশি ভারতীয় সৈন্য কাজ করেছিল, বিশেষ করে পূর্ব আফ্রিকা এবং পশ্চিম ফ্রন্টে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম ফর্টিনাইনথ বেঙ্গলি রেজিমেন্টের হয়ে যুদ্ধে গিয়েছিলেন।
- নিরপেক্ষ দেশ: ডেনমার্ক ও নেদারল্যান্ড প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিরপেক্ষ ছিল।
৪. পটভূমি: দীর্ঘমেয়াদী কারণসমূহ
যদিও সারায়েভো হত্যাকাণ্ড স্ফুলিঙ্গ ছিল, কিন্তু ইউরোপের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা উত্তেজনা ছিল আসল বারুদ:
- জাতীয়তাবাদ: বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষা (যেমন স্লাভিক জাতীয়তাবাদ) এবং ঔপনিবেশিক প্রতিযোগিতা।
- সাম্রাজ্যবাদ: ইউরোপীয় শক্তিগুলির মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা।
- সামরিকবাদ: সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং অস্ত্রের প্রতিযোগিতা।
- জোট ব্যবস্থা: ইউরোপের শক্তিগুলো দুটি বৃহৎ সামরিক জোটে (ট্রিপল আঁতাত ও ট্রিপল অ্যালায়েন্স) বিভক্ত হয়ে থাকায় স্থানীয় সংঘাত দ্রুত বৈশ্বিক যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়।
অটো ভন বিসমার্ক ১৮৮৮ সালে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন: “একদিন গ্রেট ইউরোপিয়ান যুদ্ধটি বাল্কানের কোনো একটি অভিশাপজনক নির্বোধ কাজ থেকে আসবে।” গ্যাভ্রিলো প্রিন্সিপের কাজটি সেই ভবিষ্যদ্বাণীকেই সত্য প্রমাণ করে।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
লিখেছেন: BDS Bulbul Ahmed
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা এবং শান্তির ধর্ম। একজন মুসলিম হিসেবে আমরা আমাদের পরিচয় নিয়ে গর্বিত। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপট এবং মুসলিম উম্মাহর অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে অনেক ক্ষেত্রে আমাদের লজ্জিত ও ব্যর্থ মনে হয়। ইসলামের মূল শিক্ষা থেকে দূরে সরে গিয়ে আমরা আজ যে সংকটের মুখোমুখি, তার কিছু বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হলো।

১. ইসলামের অপব্যাখ্যা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ

বর্তমানে ইসলামকে যার যার সুবিধামতো ব্যাখ্যা করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে ‘একাধিক বিবাহ’ নিয়ে যেভাবে অপব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তা অত্যন্ত বিব্রতকর। ইসলামে চার বিয়ের অনুমতি থাকলেও এর পেছনে যে কঠিন শর্ত ও ইনসাফের (ন্যায়বিচার) বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা অনেক সময় এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলে অমুসলিম বিশ্ব ও নওমুসলিমদের কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে যে, মুসলিম পুরুষ মানেই কেবল একাধিক বিয়ে।
২. আত্মপক্ষ সমর্থনের দায়ভার ও ‘ইসলামোফোবিয়া’

বিশ্বের কোথাও কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তার দায়ভার ১.৬ বিলিয়ন মুসলিমের ওপর এসে পড়ে। অনলাইনে বা অফলাইনে একজন মুসলিমকে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হয় যে সে ‘জঙ্গি’ নয়। হিজাব পরিধান করা যে একজন নারীর স্বাধীন ইচ্ছা হতে পারে—এই সহজ সত্যটুকুও আমরা বিশ্বকে বোঝাতে ব্যর্থ হচ্ছি। নিজেদের সঠিক অবস্থান তুলে ধরতে না পারা আমাদের এক বড় ব্যর্থতা।
৩. অনৈক্য ও পরশ্রীকাতরতা

মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যের অভাব আজ প্রকট। রোহিঙ্গা ইস্যুর মতো বড় মানবিক সংকটে যখন কোনো শক্তিশালী মুসলিম দেশ নয়, বরং গাম্বিয়ার মতো একটি ছোট দেশ আন্তর্জাতিক আদালতে লড়াই করে, তখন আমাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আমরা অন্যের ভুল খুঁজতে যতটা পটু, নিজেদের সংশোধনে ততটাই উদাসীন।
৪. ভূ-রাজনৈতিক স্ববিরোধিতা

মুসলিম বিশ্বের তথাকথিত ‘মোড়ল’ রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা অনেক সময় সাধারণ মুসলমানদের ব্যথিত করে। ইয়েমেনের মানবিক বিপর্যয়, ফিলিস্তিন ইস্যুতে রহস্যজনক নীরবতা কিংবা বিভিন্ন দেশে মুসলিমদের ওপর চলা অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হওয়া—আমাদের লজ্জিত করে। ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা মুসলিম উম্মাহর জন্য বড় ক্ষতি বয়ে আনছে।
৫. দেশপ্রেম ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে অনীহা

‘দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ’—এই শিক্ষা ভুলে গিয়ে অনেক মুসলিম দেশ আজ অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও গৃহযুদ্ধে লিপ্ত। এছাড়া সোনালী অতীতে বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও দর্শনে মুসলিম মনীষীদের যে কালজয়ী অবদান ছিল, তা আজ ইতিহাসের পাতায় বন্দী। আমরা আমাদের পূর্বসূরিদের আবিষ্কার ও অবদান সম্পর্কে নিজেরাই জানি না, ফলে পশ্চিমাদের চোখে আমরা আজ একটি ‘পিছিয়ে পড়া’ জাতিতে পরিণত হয়েছি।
বিডিএস পর্যবেক্ষণ: ইসলামের সৌন্দর্য তখনই বিকশিত হবে যখন আমাদের কথায় ও কাজে মিল থাকবে। আমরা যদি অন্যের দোষ না খুঁজে নিজেদের চরিত্র ও জ্ঞান দিয়ে বিশ্ব জয় করতে পারি, তবেই আমাদের হৃত গৌরব ফিরে পাওয়া সম্ভব। কেবল ধর্মের গান গেয়ে নয়, বরং ইসলামের প্রকৃত আদর্শ ধারণ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
এক নজরে বর্তমান মুসলিম বিশ্বের বড় চ্যালেঞ্জসমূহ:
| চ্যালেঞ্জ | বর্তমান অবস্থা |
| সামাজিক | ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা ও ব্যক্তিগত নৈতিকতার অভাব। |
| রাজনৈতিক | মুসলিম দেশগুলোর অনৈক্য ও স্বার্থকেন্দ্রিক কূটনীতি। |
| সাংস্কৃতিক | মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়ানো ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলায় ব্যর্থতা। |
| শিক্ষাগত | আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পশ্চিমাদের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা। |
তথ্যসূত্র (Source):
- আল কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ: ন্যায়বিচার ও ইনসাফ সংক্রান্ত বিধান।
- আল জাজিরা ও রয়টার্স: ইয়েমেন ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বৈশ্বিক প্রতিবেদন।
- বিডিনিউজ২৪: মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
লিখেছেন: BDS Bulbul Ahmed
বিভাগ: ইতিহাস ও নারী জাগরণ
উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে যখন বাঙালি নারীদের পরিচয় কেবল অন্তঃপুরের আড়ালে সীমাবদ্ধ ছিল, তখন এক নির্ভীক নারী নিজের মেধা, সৃজনশীলতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে তৈরি করেছিলেন এক স্বতন্ত্র ইতিহাস। তিনি সরলা দেবী চৌধুরাণী—যিনি একাধারে সাহিত্যিক, সমাজসেবী, শিক্ষাবিদ এবং ভারতের প্রথম দিককার নারী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব।

১. জন্ম ও জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির প্রভাব

সরলা দেবীর জন্ম ১৮৭২ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর কলকাতার বিখ্যাত জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে। তাঁর পিতা জানকীনাথ ঘোষাল ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং মাতা স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অগ্রজ প্রখ্যাত সাহিত্যিক। সম্পর্কে কবিগুরু ছিলেন সরলা দেবীর ছোট মামা। ঠাকুরবাড়ির মুক্ত সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক আবহে বড় হওয়া সরলা দেবীর জীবনে ‘রবি মামা’র প্রভাব ছিল অপরিসীম।
২. শিক্ষার আলোকবর্তিকা ও ‘পদ্মাবতী স্বর্ণপদক’

অদম্য মেধাবী সরলা দেবী ১৮৮৬ সালে এন্ট্রান্স পাস করে বেথুন কলেজে ভর্তি হন। ১৮৯০ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সসহ বি.এ. পাস করেন। সেই সময় মেয়েদের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় তিনি লাভ করেন মর্যাদাপূর্ণ ‘পদ্মাবতী স্বর্ণপদক’। সে আমলের নারীদের জন্য এটি ছিল এক অভাবনীয় মাইলফলক।
৩. স্বাবলম্বী হওয়ার লড়াই ও ‘লক্ষ্মী ভাণ্ডার’

তৎকালীন উচ্চবিত্ত সমাজের নারীরা জীবিকা অর্জনের কথা চিন্তা না করলেও সরলা দেবী ছিলেন ব্যতিক্রম। পরিবারের অমত সত্ত্বেও তিনি মহীশূরের মহারাণী গার্লস কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। স্বদেশী পণ্য প্রসারের লক্ষ্যে ১৯০৪ সালে তিনি বৌবাজারে স্থাপন করেন ‘লক্ষ্মী ভান্ডার’। এটি কেবল একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল না, বরং স্বদেশী আন্দোলনের একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক স্তম্ভ ছিল।
৪. বন্দেমাতরমের সুরকার ও বিপ্লবী চেতনা

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী গান ‘বন্দেমাতরম’-এর প্রথম স্তবকের সুর দিয়েছিলেন সরলা দেবী চৌধুরাণী। এটি তাঁর দেশপ্রেমের এক অনন্য স্বাক্ষর। এছাড়াও যুবকদের আত্মরক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে তিনি ‘প্রতাপাদিত্য উৎসব’ ও ‘বীরাষ্টমী ব্রত’ পালনের সূচনা করেন। তরবারি চালনা ও লাঠি খেলার প্রচলনের মাধ্যমে তিনি বাঙালি যুবকদের মধ্যে বীরত্ব জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন।
৫. ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল ও নারী আন্দোলন

১৯১০ সালে এলাহাবাদে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল’। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এটিই ছিল ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় নারী সংগঠন। দিল্লি, কানপুর, ইলাহাবাদসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এর শাখা ছড়িয়ে ছিল, যার মাধ্যমে নারীদের হাতের কাজ ও শিক্ষা বিস্তারের কাজ চলত।
৬. মহাত্মা গান্ধী ও ব্যক্তিগত জীবন

১৯০৫ সালে তিনি বিপ্লবী ও সাংবাদিক রামভুজ দত্ত চৌধুরীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং পাঞ্জাবে চলে যান। সেখানে তিনি তাঁর স্বামীর সাথে ‘হিন্দুস্তান’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। জীবনের শেষভাগে তিনি বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর কাছে দীক্ষা নিয়ে আধ্যাত্মিক পথে চলে যান।
বিডিএস পর্যবেক্ষণ: সরলা দেবী কেবল ঠাকুরবাড়ির একজন নক্ষত্র ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন নারীবাদ ও স্বনির্ভরতার মূর্ত প্রতীক। তাঁর আত্মজীবনী ‘জীবনের ঝরাপাতা’ আজও গবেষকদের কাছে সেই সময়ের ইতিহাসের আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।
এক নজরে সরলা দেবী চৌধুরাণী:
| বিষয় | তথ্য |
| জন্ম | ৯ সেপ্টেম্বর ১৮৭২। |
| প্রধান পরিচয় | সাহিত্যিক, সুরকার ও সমাজ সংস্কারক। |
| সুরারোপিত গান | বন্দেমাতরম (প্রথম স্তবক)। |
| সংগঠন | লক্ষ্মী ভাণ্ডার, ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল। |
| বিখ্যাত বই | জীবনের ঝরাপাতা (আত্মজীবনী), নববর্ষের স্বপ্ন। |
| মৃত্যু | ১৮ আগস্ট ১৯৪৫। |
তথ্যসূত্র (Source):
- উইকিপিডিয়া: সরলা দেবী চৌধুরাণী – জীবনী।
- বাংলাপিডিয়া: চৌধুরানী, সরলাদেবী – জাতীয় জ্ঞানকোষ।
- অনুশীলন: সরলা দেবী ও ঠাকুরবাড়ির ইতিহাস।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
লিখেছেন: [BDS Bulbul Ahmed]
বিভাগ: অপরাধ ও রাজনীতি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিতর্কিত নাম লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ১৯৭৫ সালে রক্ষীবাহিনীতে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করা এই ব্যক্তি ক্ষমতার পালাবদলে বারবার নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে টিকে ছিলেন। তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বেরিয়ে আসছে তার অন্ধকার জগতের নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য।


মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল রক্ষীবাহিনীর সদস্য হিসেবে। পরবর্তীতে সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেও ২০০৭ সালের ‘এক-এগারো’র সময় তিনি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসেন। তৎকালীন টাস্ক ফোর্সের প্রধান হিসেবে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের ওপর নির্যাতন এবং ‘ট্রুথ কমিশন’-এর নামে কোটি কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অনেকের কাছে তিনি ‘ইন্ডিয়ান পাপেট’ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
২. আওয়ামী লীগের ‘ছায়া’ ও রাজনৈতিক সুবিধা

ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে তিনি ছিলেন সবচাইতে বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের একজন। এর পুরস্কারস্বরূপ:
- কূটনৈতিক পদ: নিয়ম বহির্ভূতভাবে তিন দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
- সংসদ সদস্য: জাতীয় পার্টির মনোনয়নে ফেনী-৩ আসন থেকে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, যা মূলত আওয়ামী লীগের সাথে সমঝোতারই অংশ ছিল।
৩. ২৪ হাজার কোটি টাকার সিন্ডিকেট ও মানবপাচার

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে সবচাইতে বড় অভিযোগ হলো মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির নামে গড়ে তোলা বিশাল সিন্ডিকেট। দরিদ্র শ্রমিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিয়ে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এছাড়া ১০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং মামলাও চলছে।
৪. জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যার অভিযোগ ও গ্রেপ্তার

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে ফেনীতে নিজাম হাজারীর সাথে যোগসাজশে ১১ জন নিরীহ শিক্ষার্থীকে হত্যার সরাসরি অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় বর্তমানে তার নামে তিনটি হত্যা মামলা বিচারাধীন।
দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর ২৩ মার্চ ২০২৬ গভীর রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আদালত তাকে দুই দফায় মোট ১১ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। গ্রেপ্তারের পর আদালতে নেওয়ার সময় বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে লক্ষ্য করে ডিম ও নোংরা পানি নিক্ষেপ করে ক্ষোভ প্রকাশ করে।
বিডিএস পর্যবেক্ষণ: ক্ষমতার দাপটে যারা সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করে এবং রক্তের হোলি খেলায় মেতে ওঠে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের করুণ পরিণতি অনিবার্য। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর এই পতন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে বর্তমান মামলাসমূহ:
| মামলার ধরণ | সংখ্যা/বিবরণ |
| হত্যা মামলা | জুলাই আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩টি। |
| মানি লন্ডারিং | ১০০ কোটি টাকা পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ। |
| মানবপাচার | মালয়েশিয়া সিন্ডিকেট ও ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ। |
| অন্যান্য | দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির একাধিক মামলা (মোট ১১টি)। |
তথ্যসূত্র (Source):
- প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার: মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রেপ্তার ও রিমান্ড সংক্রান্ত প্রতিবেদন।
- বিডিনিউজ২৪: এক-এগারোর ভূমিকা ও ট্রুথ কমিশন নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।
- ফেনী জেলা প্রতিনিধি: জুলাই হত্যাকাণ্ডে দায়েরকৃত মামলার বিবরণী।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



